আমার প্রিয় ভাই বা আপু, আপনি কি বিদেশ যাওয়ার প্ল্যান করছেন? কিংবা ভাবছেন ভবিষ্যতের জন্য পাসপোর্টটা রেডি করে রাখি? কিন্তু পাসপোর্ট অফিসের দালাল আর লম্বা লাইনের কথা চিন্তা করলেই কি আপনার জ্বর চলে আসে? বিশ্বাস করুন, সেই দিন এখন আর নেই। এখন ২০২৬ সালে এসে বাংলাদেশ সরকার ই-পাসপোর্ট বা ইলেকট্রনিক পাসপোর্ট করার সিস্টেমটাকে এতটাই সহজ করেছে যে, আপনি চাইলেই ঘরে বসে আপনার স্মার্টফোন বা ল্যাপটপ দিয়ে আবেদন করে ফেলতে পারবেন।
আমি নিজে গত মাসে আমার ছোট ভাইয়ের পাসপোর্ট করিয়েছি কোনো দালালের সাহায্য ছাড়াই। সেই অভিজ্ঞতার আলোকেই আজ আপনাদের সাথে শেয়ার করব ই-পাসপোর্ট করার নিয়ম, খরচ এবং পুলিশ ভেরিফিকেশন এর খুঁটিনাটি সব বিষয়। যাতে আপনার কষ্টের টাকা কোনো দালালের পকেটে না যায়।
ই-পাসপোর্ট কেন করবেন?
এমআরপি (MRP) পাসপোর্টের দিন শেষ। এখন যুগ স্মার্ট পাসপোর্টের। ই-পাসপোর্টে একটি ক্ষুদ্র চিপ থাকে যেখানে আপনার চোখের আইরিশ, ফিঙ্গারপ্রিন্ট এবং সব তথ্য ডিজিটালভাবে সংরক্ষিত থাকে। এয়ারপোর্টে ই-গেট ব্যবহার করে আপনি মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ইমিগ্রেশন পার হতে পারবেন, লাইনে দাঁড়ানোর কোনো প্যারা নেই!
ই-পাসপোর্ট আবেদনের জন্য কী কী লাগবে? (প্রয়োজনীয় কাগজপত্র)
অনলাইনে E-Passport Apply করতে বসার আগে নিচের কাগজগুলো হাতের কাছে গুছিয়ে নিন, যাতে মাঝপথে আবার উঠতে না হয়:
১. জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) অথবা জন্ম নিবন্ধন সনদ: আপনার বয়স ১৮ এর বেশি হলে এনআইডি মাস্ট লাগবেই। আর ১৮ এর কম হলে অনলাইন জন্ম নিবন্ধন কপি লাগবে।
২. পুরনো পাসপোর্ট (যদি থাকে): আগে কোনো পাসপোর্ট করা থাকলে তার তথ্য দিতে হবে।
৩. নাগরিক সনদ ও পেশার প্রমাণপত্র: স্টুডেন্ট হলে আইডি কার্ড, চাকরিজীবী হলে অফিস আইডি বা এনওসি (NOC) লাগবে।
৪. বাবা-মায়ের এনআইডি কপি: ফরম পূরণের সময় তথ্যের মিল রাখার জন্য এটি দরকার।
অনলাইনে ই-পাসপোর্ট আবেদন করার নিয়ম
কোনো দোকানে গিয়ে ২০০-৩০০ টাকা খরচ করার দরকার নেই। নিজের কাজ নিজেই করুন। যেহুতো আপনি আমার প্রিয় এই পোস্টটি পড়ছেন তাই আর কোনো দোকন দরকার নেই। খালি এই নিয়মন গুলি ফলো করুন।
-
প্রথমে চলে যান ই-পাসপোর্টের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে epassport.gov.bd
-
সেখানে ‘Apply Online’ এ ক্লিক করুন।
-
প্রথমে আপনার জেলা এবং থানার নাম সিলেক্ট করুন।
-
এরপর আপনার ইমেইল দিয়ে একটি একাউন্ট খুলে ফেলুন।
-
ধাপে ধাপে আপনার ব্যক্তিগত তথ্য (নাম, বাবার নাম, মায়ের নাম) একদম এনআইডি কার্ড দেখে দেখে পূরণ করবেন। মনে রাখবেন, এখানে একটি বানানের ভুল মানেই পরবর্তীতে বিশাল ভোগান্তি।
টিপস: ফর্ম পূরণের সময় ‘Delivery Type’ এর জায়গায় রেগুলার (Regular) না এক্সপ্রেস (Express) ডেলিভারি নিবেন, তা ভেবেচিন্তে সিলেক্ট করবেন। কারণ এর ওপর ভিত্তি করেই আপনার পাসপোর্টের ফি নির্ধারণ হবে।
ই-পাসপোর্ট করতে কত টাকা লাগে? (ফি ২০২৬)
অনেকেই এই জায়গাটিতে এসে কনফিউজড হয়ে যান। ২০২৬ সালের বর্তমান আপডেট অনুযায়ী ৪৮ পাতা এবং ৬৪ পাতার পাসপোর্টের ফি ভিননো। সাথে যোগ হবে ১৫% ভ্যাট। তাও একটা সহজ হিসাব দিচ্ছি:
৪৮ পাতার পাসপোর্ট (মেয়াদ ৫ বছর):
-
রেগুলার ডেলিভারি (১৫-২১ দিন): ৪,০২৫ টাকা
-
এক্সপ্রেস ডেলিভারি (৭-১০ দিন): ৬,৩২৫ টাকা
-
সুপার এক্সপ্রেস (২ দিন): ৮,৬২৫ টাকা
৪৮ পাতার পাসপোর্ট (মেয়াদ ১০ বছর):
-
রেগুলার ডেলিভারি: ৫,৭৫০ টাকা
-
এক্সপ্রেস ডেলিভারি: ৮,০৫০ টাকা
-
সুপার এক্সপ্রেস: ১০,৩৫০ টাকা
(বিদ্র: ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়ার সময় অবশ্যই আপনার অ্যাপ্লিকেশনের রেফারেন্স নম্বরটি সঠিকভাবে লিখবেন, নাহলে পেমেন্ট ভেরিফাই হবে না।)
বায়োমেট্রিক এনরোলমেন্ট ও ছবি তোলা
অনলাইনে আবেদন সাবমিট করার পর একটা পিডিএফ ফাইল পাবেন। সেটা প্রিন্ট করে সাথে এনআইডি কার্ডের কপি, ব্যাংক ড্রাফট বা চালানের কপি এবং আগের কোনো পাসপোর্ট থাকলে সেটা নিয়ে আপনার নির্ধারিত পাসপোর্ট অফিসে চলে যাবেন।
সেখানে আপনার ১০ আঙ্গুলের ছাপ, চোখের আইরিশ স্ক্যান এবং ছবি তোলা হবে। মনে রাখবেন, পাসপোর্ট অফিসে যাওয়ার দিন সাদা বা খুব হালকা রঙের জামা না পরাই ভালো, কারণ ব্যাকগ্রাউন্ড সাদা থাকে। গাঢ় রঙের পোশাকে ছবি ভালো আসে।
পুলিশ ভেরিফিকেশন নিয়ে ভয়?
এখন অনেকেই ভাবছেন পুলিশ ভেরিফিকেশন মানেই তো এক গাড়ি টাকা খরচ। না ভাই, বিশ্বাস করেন, আপনার যদি সব কাগজপত্র ঠিক থাকে এবং আপনার নামে কোনো মামলা না থাকে, তবে পুলিশ ভেরিফিকেশন এখন অনেক স্মুথ। পুলিশ অফিসার আপনার বাসায় এসে তথ্য যাচাই করবেন। সততার সাথে তথ্য দিলে কোনো হয়রানি হওয়ার কথা না। তবে হ্যাঁ, মিষ্টি খাওয়ার কালচারটা তো আমাদের দেশে আছেই, সেটা পরিস্থিতি বুঝে হ্যান্ডেল করবেন!
আমার ব্যক্তিগত কিছু পরামর্শ
অবশ্যই আপনার এনআইডি এবং জন্ম নিবন্ধনের তথ্যের সাথে যেন আবেদনের তথ্যের ১০০% মিল থাকে। এক চুল এদিক ওদিক হলে পাসপোর্ট আটকে যাবে। এবং এনআইডি কার্ডে বা ফর্মে যে স্বাক্ষর দিয়েছেন, বায়োমেট্রিক দেওয়ার সময় প্যাডে ঠিক একই স্বাক্ষর দেবেন। আর অ্যাপয়েন্টমেন্ট ডেটে সকাল সকাল পাসপোর্ট অফিসে চলে যাবেন। দুপুরের পর ভিড় বাড়ে এবং সার্ভার স্লো হতে পারে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
নিচে ই-পাসপোর্ট নিয়ে পাঠকদের করা কিছু কমন প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হলো:
অনলাইনে ই-পাসপোর্ট স্ট্যাটাস চেক করব কীভাবে?
উত্তর: খুব সহজেই ঘরে বসে পাসপোর্টের বর্তমান অবস্থা জানতে পারবেন। ই-পাসপোর্টের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট epassport.gov.bd এ গিয়ে ‘Check Status’ অপশনে ক্লিক করুন। এরপর আপনার অ্যাপ্লিকেশন আইডি (Application ID) এবং জন্ম তারিখ দিলেই দেখতে পাবেন আপনার পাসপোর্টটি কোন পর্যায়ে আছে।
আবেদনে ভুল তথ্য দিয়ে ফেললে তা সংশোধন করার উপায় কী?
উত্তর: অনলাইনে আবেদন সাবমিট করার পর যদি দেখেন কোনো ভুল হয়েছে, তবে চিন্তার কিছু নেই। টাকা জমা দেওয়ার পর বায়োমেট্রিক (আঙ্গুলের ছাপ ও ছবি তোলা) দিতে যখন পাসপোর্ট অফিসে যাবেন, তখন কাউন্টারে দায়িত্বরত কর্মকর্তাকে ভুলের বিষয়টি জানালে তিনি সাথে সাথে সেটি সংশোধন করে দেবেন। তবে পাসপোর্ট প্রিন্ট হয়ে গেলে তখ সংশোধন করা কঠিন।
৫ বছর নাকি ১০ বছর মেয়াদি পাসপোর্ট কোনটা করা ভালো?
উত্তর: আপনার বয়স যদি ১৮ থেকে ৬৫ বছরের মধ্যে হয়, তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে ১০ বছর মেয়াদি পাসপোর্ট করার পরামর্শ দেব। এতে বারবার রিনিউ করার ঝামেলা থাকে না এবং খরচও সাশ্রয় হয়। তবে ১৮ বছরের নিচে এবং ৬৫ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য সাধারণত ৫ বছর মেয়াদি পাসপোর্ট দেওয়া হয়।
ই-পাসপোর্ট ফি কি বিকাশে বা রকেটে দেওয়া যায়?
উত্তর: হ্যাঁ, এখন ই-পাসপোর্টের ফি জমা দেওয়া অনেক সহজ। আপনি সোনালী ব্যাংক, প্রিমিয়ার ব্যাংকসহ নির্ধারিত ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি ‘একপে’ (EkPay) এর মাধ্যমে বিকাশ, রকেট বা নগদেও ঘরে বসে ফি পরিশোধ করতে পারেন।
ই-পাসপোর্ট করতে কি সত্যায়িত (Attestation) কাগজের প্রয়োজন হয়?
উত্তর: না, বর্তমান নিয়মে ই-পাসপোর্ট করার জন্য কোনো কাগজপত্রের সত্যায়িত কপির প্রয়োজন হয় না। তবে অরিজিনাল কপিগুলো ভেরিফিকেশনের জন্য সাথে রাখা ভালো।
শেষ কথা
সো বন্ধুরা, পাসপোর্ট একজন নাগরিকের অনেক বড় অধিকার এবং পরিচয়। দালালের খপ্পরে পড়ে অতিরিক্ত টাকা খরচ না করে, একটু সাহস করে নিজেই আবেদনটা করে ফেলুন। ই-পাসপোর্ট করার নিয়ম এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ।
আশা করি আমার এই লেখাটি আপনাদের উপকারে আসবে। তার পরেও কোথাও বুঝতে সমস্যা হলে বা কোনো প্রশ্ন থাকলে নিচে নির্দ্বিধায় কমেন্ট করুন। আমি চেষ্টা করব আপনাদের সঠিক তথ্য দিয়ে সাহায্য করতে। লেখাটি ভালো লাগলে শেয়ার করে অন্যদেরও জানার সুযোগ করে দিন। সবার জন্য শুভকামনা! আল্লাহ হাফেজ……..


