ড্রাগন ফল চাষ পদ্ধতি ও বাগান পরিচর্যা ২০২৬

ড্রাগন ফল চাষ পদ্ধতি ২০২৬: চারা রোপণ থেকে লাভ-ক্ষতির সঠিক হিসাব ও পরিচর্যা

আসসালামু আলাইকুম কৃষি প্রেমী ভাই ও বোনেরা। কেমন আছেন সবাই?
আজকাল আমাদের দেশে কৃষিতে বিপ্লব ঘটে গেছে বললেই চলে। আপনারা অনেকেই হয়তো ভাবছেন, ভাই আসলেই কি ড্রাগন ফল চাষ করে লাভ হয় নাকি লস?

চিন্তার কোনো কারণ নেই! আমার প্রিয় ডট কম-এর আজকের এই আর্টিকেলে আমি আমার নিজের দেখা এবং অভিজ্ঞ চাষিদের পরামর্শ নিয়ে ড্রাগন ফল চাষ পদ্ধতি, সঠিক যত্ন এবং লাভ-ক্ষতির একদম খাঁটি হিসাবটা আপনাদের সামনে তুলে ধরার চেস্টা করছি। সাথে থাকছে ২০২৬ সালের আধুনিক কিছু টেকনিক যা আপনার ফলন দ্বিগুণ হতে পারে। তাই চলুন তাহলে শুরু করি!

ড্রাগন ফল চাষ

বাংলাদেশের কৃষিতে স্বল্প খরচে অধিক লাভজনক আয়ের অন্যতম উৎস হলো ড্রাগন ফল চাষ।
ক্যাকটাস জাতীয় এই গাছটি রোপণের জন্য খুব বেশি উর্বর জমির প্রয়োজন হয় না, বরং পানি জমে না এমন বেলে দোআঁশ মাটি এবং প্রচুর রোদযুক্ত উঁচু জমিতে এর ফলন সবচেয়ে ভালো হয়।

সাধারণত সিমেন্টের খুঁটি বা পিলারের সাহায্যে এটি চাষ করা হয় এবং একবার বাগান তৈরি করলে সঠিক পরিচর্যায় টানা ২০ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত ফল পাওয়া যায়।

সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণে ভরপুর হওয়ায় বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা ও ভালো দামও রয়েছে।
তাই বাণিজ্যিক বাগান কিংবা শখের ছাদ কৃষি সব জায়গাতেই ড্রাগন চাষ এখন বেকার যুবক ও নতুন উদ্যোক্তাদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

ড্রাগন চাষের জন্য উপযুক্ত মাটি ও জলবায়ু

ভাই, গাছ লাগালেই তো আর ফল ধরে না! মাটির গুণাগুণ বুঝতে হবে। ড্রাগন ফলের জন্য এমন জমি বালতে হবে যেখানে পানি জমে না। পানি জমলে ড্রাগনের গোড়া পচে যেতে পারে।

  • মাটি: বেলে দোআঁশ মাটি ড্রাগন চাষের জন্য সবচেয়ে সেরা। তবে এটেল মাটিতেও জৈব সার বেশি দিয়ে চাষ করা যায়। আমাদের এলাকাই এমন অনেকে আছে এভাবেও চাষ করছে।

  • আলো-বাতাস: এই গাছ প্রচুর রোদ পছন্দ করে। তাই ছায়াযুক্ত জায়গায় বাগান করবেন না, ফলন কম হবে। এজন্যই বলছি ড্রাগন ফল চাষ করার জন্য সবচেয়ে ভালো হয় ছাদে বা একদম ফাকা মাঠে।

ড্রাগন ফলের চারা রোপণ পদ্ধতি ও সঠিক সময়

এই ফল চাষের আসল টেকনিকই হলো সঠিক সময়ে সঠিক চারা লাগানো। আপনিও ড্রাগন বীজ থেকে চারা করতে পারেন, তবে কাটিং বা ডাল কেটে লাগানো চারাতে ফল তাড়াতাড়ি আসে।

ড্রাগন গাছ কখন লাগাবেন?
সাধারণত এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ড্রাগন লাগানোর উপযুক্ত সময় থাকে। তবে সেচের ব্যবস্থা থাকলে শীতকাল বাদে সারা বছরই লাগানো যাবে।

চারা রোপণের নিয়ম:
জমিতে গর্ত করার সময় গর্তের আকার ১.৫ ফুট বাই ১.৫ ফুট রাখবেন।
গর্তে প্রচুর পরিমাণে গোবর সার প্রায় ১০-১৫ কেজি, টিএসপি এবং পটাশ সার মাটির সাথে মিশিয়ে ১০ দিন রেখে দিবেন।
এরপর সিমেন্টের পিলারের চারপাশ দিয়ে ৪টি চারা রোপণ করুন। মনে রাখবেন, চারা বেশি গভীরে পুঁতবেন না, ১-২ ইঞ্চি মাটির নিচে দিলেই হবে।

ড্রাগন ফলের সার ব্যবস্থাপনা ও যত্ন

গাছ তো লাগালেন, এখন খাবার দিবেন না? ড্রাগন গাছ কিন্তু বেশ ভোজনরসিক! নিয়মিত খাবার না দিলে ফলের সাইজ ছোট হয়ে যাবে।

বছরে অন্তত ৩ বার সার দিতে হয়। বর্ষার আগে একবার, বর্ষার শেষে একবার এবং শীতের আগে একবার। ইউরিয়া, ফসফেট ও পটাশ সার পরিমাণমতো গাছের গোড়া থেকে একটু দূরে ছিটিয়ে দিবেন।

শীতকালে ১৫ দিন পর পর হালকা সেচ দিবেন। আর বর্ষাকালে খেয়াল রাখবেন যেন গাছের গোড়ায় পানি না জমে।

এটাই হলো গোপন টিপস! ভাই, গাছের সব ডাল রাখা যাবে না। যে ডালগুলো রোগা, চিকন বা নিচের দিকে ঝুলে আছে, সেগুলো কেটে ফেলুন। এতে মূল ডালগুলো পুষ্টি বেশি পাবে এবং মোটা তাজা ফল দিবে।

টবে বা ছাদে ড্রাগন চাষ পদ্ধতি

শহরের ভাই-বোনেরা মন খারাপ করবেন না। আপনাদের ছাদেই ড্রাগন খুব ভালো হয়। ২০ ইঞ্চি বা তার বড় সাইজের ড্রামে বা মাটির টবে ড্রাগন লাগাতে পারেন।

মাটির সাথে হাড়ের গুঁড়া, শিং কুচি আর ভার্মি কম্পোস্ট মিশিয়ে মাটি তৈরি করবেন। ছাদে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা যেন ভালো থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখবেন।

কে বলেছে ছাদে ড্রাগন ফল চাষ করা যায় না? শহরে থাকলে খেয়াল করবেন প্রায় ছাদেই এখন ড্রাগন ফল চাষ করছে অনেক কৃষি পেমী মানুষ রা।

ড্রাগন ফল চাষে লাভ ক্ষতি হিসাব

আসল কথায় আসি টাকা পয়সার ব্যাপারে! ভাই, ড্রাগন চাষ হলো একবার বিনিয়োগ, আর ২০ বছর ফল ভোগ।
ধরুন, আপনি ১ বিঘা (৩৩ শতাংশ) জমিতে ড্রাগন চাষ করবেন।

তাতে পিলার, চারা, সার, বেড়া এবং শ্রমিক সব মিলিয়ে প্রথম বছরে খরচ হতে পারে প্রায় ২ থেকে ২.৫ লাখ টাকা। ২০২৬ এর বাজার দর অনুযায়ী।

যদিও প্রথম বছরে ফলন একটু কম হয়, তবুও ১-১.৫ লাখ টাকার ফল বিক্রি করা সম্ভব। কিন্তু ২য় বছর থেকে আসল খেলা শুরু! প্রতি বিঘা থেকে বছরে ৪-৫ লাখ টাকার ফল বিক্রি করা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার।

বর্তমানে বাজারে লাল, হলুদ এবং সাদা ড্রাগনের চাহিদা প্রচুর। পাইকারি বাজারেও কেজি ১৫০-২৫০ টাকা। তাই লস হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম যদি না বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ আসে।

রোগবালাই ও প্রতিকার

ড্রাগন গাছে খুব একটা রোগ হয় না। তবে মাঝেমধ্যে গোড়া পচা রোগ বা পোকার আক্রমণ হতে পারে। তাই গোড়া পচা রোধে ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে পারেন।

আর পিঁপড়া বা মিলিবাগ ধরলে সাবান পানি স্প্রে করে ধুয়ে দিবেন বা কীটনাশক ব্যবহার করবেন। ড্রাগন ফল চাষ করতে এই গুলোই যথেষ্ট।

আমার প্রিয় কিছু পরামর্শ

কৃষি মানেই ধৈর্য। আপনি আজ গাছ লাগালেন আর কালই ফল খাবেন, এমনটা ভাবলে হবে না। ড্রাগন চাষে প্রথম বছর একটু খরচ বেশি হয়, কিন্তু ২য় বছর থেকে এটা আপনাকে দুহাত ভরে দিবে ইনশাআল্লাহ।

নতুন যারা ড্রাগন ফল চাষ শুরু করতে চাচ্ছেন, তাদের বলবো শুরুতে অল্প জমিতে বা ১০-১২টি পিলার দিয়ে শুরু করুন। অভিজ্ঞতা বাড়লে বাগান বড় করবেন। আর কোনো সমস্যায় পড়লে স্থানীয় কৃষি অফিস বা অভিজ্ঞ চাষির পরামর্শ নিবেন।

ভাই, লেখাটা পড়ে যদি মনে হয় আপনার উপকারে এসেছে, তাহলে শেয়ার করে অন্য কৃষি প্রেমীদের জানার সুযোগ করে দিবেন। আপনাদের সফলতাই আমার প্রিয় ডট কম-এর সার্থকতা। ভালো থাকবেন, দেশের মাটির সাথেই থাকবেন।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন: ড্রাগন গাছ কত বছর ফল দেয়?
উত্তর: সঠিক যত্ন নিলে একটি ড্রাগন গাছ ২০ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত টানা ফল দিতে পারে।

প্রশ্ন: ১ বিঘা জমিতে কতগুলো ড্রাগন চারা লাগে?
উত্তর: পিলারের দূরত্বের ওপর ভিত্তি করে সাধারণত ১ বিঘা জমিতে ১১০-১২০টি পিলার এবং প্রতি পিলারে ৪টি করে প্রায় ৪৪০-৪৮০টি চারা লাগে।

প্রশ্ন: হলুদ ড্রাগন নাকি লাল ড্রাগন, কোনটি বেশি লাভজনক?
উত্তর: লাল ড্রাগন বেশি ফলন দেয়, কিন্তু হলুদ ড্রাগনের বাজার মূল্য বেশি। তবে নতুনদের জন্য লাল ড্রাগন (Red Velvet) চাষ করাই নিরাপদ ও লাভজনক।

×
Scroll to Top