আজকে আমরা এমন একটা বিষয় নিয়ে কথা বলবো, যেটাতে আমাদের দেশের লাখ লাখ মানুষ প্রতিদিন প্রতারিত হচ্ছে। আর সেটি হলো সেকেন্ড হ্যান্ড বা পুরাতন মোবাইল কেনাবেচা!
বর্তমান বাজারে নতুন স্মার্টফোনের যা দাম, তাতে ভালো প্রসেসর আর ক্যামেরার একটা ফোন কিনতে গেলে পকেট ফাঁকা হয়ে যাওয়ার বিকল্প নাই বললেই চলে। তাই অনেক স্টুডেন্ট এবং সাধারণ মানুষ একটু কম দামে ভালো স্পেসিফিকেশনের আশায় পুরাতন মোবাইলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ভাই, পুরাতন মোবাইল কেনা আর লটারি জেতা প্রায় সমান কথা! তাই না?
সাবধান!
দোকানদার বা অপরিচিত কোনো বিক্রেতা আপনাকে চকচকে একটা ফোন হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলবে ভাই, ফোন একদম ফ্রেশ, কোনো খোলা মেলা বা কোনো ফিটিং নেই! আর আপনিও খুশিতে গদগদ হয়ে সেই পুরাতন মোবাইল কিনে বাসায় নিয়ে আসলেন। দুই দিন পর দেখলেন ব্যাটারি চার্জ থাকে না, অথবা ডিসপ্লে কাজ করছে না। সবচেয়ে বড় বিপদ হয় তখন, যখন জানতে পারেন ফোনটি আসলে চোরাই! তখন কেমন লাগবে বলেন তো?
তাই আপনাদের কষ্টের টাকা যেন জলে না যায়, সেজন্য আজ আমি আপনাদের শেখাবো সেকেন্ড হ্যান্ড মোবাইল কেনার আগে করণীয় ৫টি গোপন ট্রিকস। ফোন হাতে নিয়ে এই ৫টি জিনিস চেক করলে পৃথিবীর কোনো অসাধু বিক্রেতা আপনাকে ঠকাতে পারবে না ইনশাল্লাহ!
১. পুরাতন মোবাইলটি চোরাই কিনা চেক করুন (IMEI Test)
পুরাতন মোবাইল কেনার আগে সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো ফোনটি চোরাই কি না। পুলিশ ট্র্যাকিং করে ধরলে জেলের ভাত খেতে হতে পারে! তাহলে কীভাবে চেক করবেন?
ফোনটি হাতে নিয়েই ডায়াল প্যাডে গিয়ে টাইপ করুন *#06#। সাথে সাথে স্ক্রিনে ১৫ ডিজিটের একটি IMEI নাম্বার ভেসে উঠবে। এবার ফোনের বক্সের গায়ে লেখা আইএমইআই (IMEI) নাম্বারের সাথে এটি মিলিয়ে দেখুন। যদি দুটো এক না হয়, তবে সেই ফোন মাগনা দিলেও নিবেন না! প্লিজ….
বক্স না থাকলে বিক্রেতার কাছ থেকে তার ন্যাশনাল আইডি কার্ডের (NID) ফটোকপি এবং একটি লিখিত মেমো অবশ্যই চেয়ে নিবেন।নয়তো ভাই পরে আপনি পস্তাবেন।
২. ডিসপ্লে অরিজিনাল নাকি চেঞ্জ করা? (Display Check)
পুরাতন মোবাইলের সবচেয়ে দামি পার্টস হলো এর ডিসপ্লে। অনেকেই ভেঙে যাওয়া ডিসপ্লে পালটে লোকাল ২-৩ হাজার টাকার মাস্টার কপি ডিসপ্লে লাগিয়ে বিক্রি করে দেয়।
-
কীভাবে চেক করবেন?
ফোনের ব্রাইটনেস (Brightness) একদম ফুল বা ১০০% করে দিন। এবার সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডের কোনো ছবি বা সেটিংসে যান। অরিজিনাল ডিসপ্লে হলে আলোটা চোখে খুব সফট লাগবে এবং সব দিকে সমান আলো থাকবে। আর লোকাল ডিসপ্লে হলে আলো খুব কড়া লাগবে, চোখ জ্বালা করবে এবং সাইড দিয়ে আলো লিক (Bleeding) করতে পারে। এছাড়া ডিসপ্লের চারপাশের বর্ডার বা গামে হাত দিয়ে ঘষে দেখুন কোনো আঠা বা গ্যাপ বোঝা যায় কিনা।
এছাড়াও ক্যামেরা ওপেন দেখতে পারেন! পরিবর্তন করা ডিসপ্লেতে ক্যামেরা ওপেন করলে ভালো খেয়াল করে দেখবেন ছবিগুলো ভেতর দিয়ে খুবই হালকা হালাকা বাম থেকে ডান লাইন টান-টান দেখা যাবে তাতে কোনো রং বা কালার দেখা যাবে না। তবে ভালো করে দেখলে সেটি স্পস্ট বোঝা যায়।
৩. ব্যাটারি হেলথ ও হিটিং ইস্যু (Battery Test)
বিক্রেতা তো বলবেই, মোবাইল পুরাতন হতে পারে ভাই কিন্তু চার্জ দুই দিন করে যায়! কিন্তু আপনি তো আর দুই দিন বসে চেক করতে পারবেন না। তাহলে ২ মিনিটেই কীভাবে চেক করবেন?
-
কীভাবে চেক করবেন?
ফোনটা হাতে নিয়ে একটানা ৫-৭ মিনিট পেছনের মেইন ক্যামেরা দিয়ে ভিডিও রেকডিং চালু করে রাখুন। অথবা ডাটা অন করে ইউটিউবে হাই-রেজুলেশনে একটা ভিডিও ছেড়ে দিন। এবার খেয়াল করুন এই ৫ মিনিটে কত পারসেন্ট চার্জ কমলো। যদি দেখেন ৫ মিনিটে ৫-৭% বা তার বেশি চার্জ ধপাস করে কমে গেছে এবং ফোনটি অস্বাভাবিক গরম হয়ে গেছে তবে বুঝবেন ওই ফোনের ব্যাটারির বারোটা বেজে গেছে!
৪. স্পিকার, সেন্সর ও নেটওয়ার্ক চেক (Hardware Check)
খুব ছোট ছোট কিছু পার্টস নষ্ট থাকলে পরে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয় আমাদের। এমনকি পরে আর আমরা এই পুরাতন মোবাইল কে কারো কাছে বেচতেও পারি না। তাহলে কি করবেন?
আপনার নিজের সিম কার্ডটি ওই ফোনে ঢুকিয়ে আপনার বন্ধুকে একটা কল দিন। লাউড স্পিকারে কথা বলে দেখুন সাউন্ড ক্লিয়ার কিনা। এরপর ফোনের ভয়েস রেকর্ডার অন করে কিছু কথা বলে প্লে করে শুনুন যে মাইক্রোফোন ঠিকমতো কাজ করছে কিনা।
কল চলাকালীন কানের কাছে হাত নিয়ে দেখুন প্রক্সিমিটি সেন্সর (স্ক্রিন অফ হয়ে যাওয়া) ঠিক আছে কিনা। সবশেষে, চার্জার কানেক্ট করে দেখুন ঠিকমতো ফাস্ট চার্জিং হচ্ছে কিনা। এগুলো খুব ছোট্ট বিষয় হলেও অনেক মুল্যবান কারণ নেটওয়ার্ক দিয়ে কি করবেন যদি কথা ই না হয়?
৫. সিক্রেট কোড দিয়ে ফুল হার্ডওয়্যার টেস্ট! (Magic Code)
অ্যান্ড্রয়েড ফোনের ভেতরে একটি সিক্রেট মেনু থাকে, যেখান থেকে এক ক্লিকেই পুরো ফোন চেক করা যায়।
-
আপনি যদি Samsung ফোন কেনেন, তবে ডায়াল প্যাডে গিয়ে টাইপ করুন *#0*#। দেখবেন চমৎকার একটা সাদা মেনু চলে আসবে। এখান থেকে আপনি টাচ (Touch), স্পিকার, ভাইব্রেশন, ক্যামেরা সবকিছু একে একে টেস্ট করে নিতে পারবেন।
-
আপনি যদি Xiaomi (Redmi/Poco) কেনেন, তবে Settings > About Phone > All Specs এ গিয়ে ‘Kernel Version’ এর ওপর দ্রুত ৪-৫ বার ট্যাপ করুন। হার্ডওয়্যার টেস্ট মেনু বা (CIT) চালু হয়ে যাবে।
আমার প্রিয় শেষ কথা
ভাই, একটা মোবাইল কেনার জন্য জমানো টাকাগুলো অনেক মায়ার। তাই ৫ মিনিট বেশি সময় লাগুক, কোনো তাড়াহুড়ো না করে উপরের এই ৫টি জিনিস খুব ঠান্ডা মাথায় চেক করে নিবেন। আর হ্যাঁ, চেষ্টা করবেন পরিচিত মানুষ বা ভরসা করা যায় এমন কোনো দোকান থেকে ফোন কেনার।
আশা করি পুরাতন মোবাইল চেনার উপায় নিয়ে আজকের এই বিস্তারিত গাইডলাইনটি আপনাদের অনেক বড় উপকারে আসবে। আপনি কি কখনো সেকেন্ড হ্যান্ড ফোন কিনে ধরা খেয়েছেন? আপনার অভিজ্ঞতা নিচে কমেন্ট বক্সে শেয়ার করুন, যাতে অন্য ভাইরাও সতর্ক হতে পারে।
আপনাদের সঠিক তথ্য দিয়ে সাহায্য করাই আমার প্রিয় ডট কম-এর মূল উদ্দেশ্য। এমনই সব দরকারি এবং সময়োপযোগী টিপস পেতে নিয়মিত ভিজিট করুন আমাদের সাইটে। ভালো থাকবেন সবাই!
FAQ:
প্রশ্ন ১: পুরাতন ফোনের অরিজিনাল বক্স না থাকলে কী করবো?
উত্তর: যদি বক্স না থাকে, তবে ফোন কেনার সময় অবশ্যই বিক্রেতার জাতীয় পরিচয়পত্রের (NID) একটি ফটোকপি নিবেন এবং সেখানে লিখে নিবেন যে “আমি এই ফোনটি অমুকের কাছ থেকে এত টাকায় কিনেছি, ফোনটি কোনো চোরাই ফোন নয়।” নিচে বিক্রেতার স্বাক্ষর নিয়ে নিবেন।
প্রশ্ন ২: আইফোন (iPhone) কেনার আগে সবচেয়ে জরুরি চেক কোনটি?
উত্তর: পুরাতন আইফোন কেনার আগে অবশ্যই ‘True Tone’ অপশনটি কাজ করছে কিনা তা চেক করবেন। ট্রু টোন কাজ না করলে বুঝবেন ডিসপ্লে পরিবর্তন করা হয়েছে। এছাড়া সেটিংসে গিয়ে ‘Battery Health’ চেক করবেন। হেলথ ৮০% এর নিচে থাকলে সেই আইফোন না কেনাই ভালো।
প্রশ্ন ৩: সেকেন্ড হ্যান্ড ফোন হিসেবে কোন ব্র্যান্ডের চাহিদা সবচেয়ে বেশি?
উত্তর: রিসেল ভ্যালু বা পরবর্তীতে সহজে বিক্রি করার কথা চিন্তা করলে বাংলাদেশে Samsung, Apple (iPhone) এবং Xiaomi-এর পুরাতন ফোনের ডিমান্ড বাজারে সবসময় বেশি থাকে।


