একটা নিজের বাইক হবে, ফাঁকা রাস্তায় বাতাস কেটে ছুটে চলবো এই স্বপ্ন আমাদের দেশের লাখো লাখো তরুণের রয়ে গেছে এখনো। কিন্তু ভাই, ২০২৬ সালে এসে নতুন বাইকের যা দাম, তাতে মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেদের জন্য একটা ভালো কনফিগারেশনের সেকেন্ড হ্যান্ড বা পুরাতন বাইক কেনা ছাড়া খুব একটা উপায় থাকে না।
আর এই সুযোগটাই নেয় কিছু অসাধু বাইক ব্যাবসায়ী এবং দালাল! তারা অ্যাক্সিডেন্ট করা বা ইঞ্জিন বসে যাওয়া বাইক গ্যারেজে নিয়ে চকচকে পলিশ করে আপনার সামনে এমনভাবে দাঁড় করাবে, দেখে মনে হবে এইমাত্র শোরুম থেকে বের হলো। আর আপনিও খুশিতে গদগদ হয়ে কিনে ২ দিন পর বুঝলেন বাইক তো না, আস্ত একটা লস প্রজেক্ট কিনেছেন! সবচেয়ে বড় বিপদ হয় তখন, যখন কাগজ চেক করতে গিয়ে দেখেন বাইকটি আসলে চোরাই! উফ্ জীবনটাই বেদনা… আর ভালো লাগে না।
তাই আপনাদের স্বপ্নের বাইকটি যেন দুঃস্বপ্ন না হয়ে যায়, সেজন্য আজ আমি আপনাদের শেখাবো সেকেন্ড হ্যান্ড বাইক কেনার আগে করণীয় ৫টি গোপন ট্রিকস। বাইক হাতে নিয়ে এই ৫টি জিনিস চেক করলে পৃথিবীর কোনো বাটপার আপনাকে ঠকাতে পারবে না!
১. পুরাতন বাইকের কাগজ চেক ও চোরাই কিনা দেখা
বাইকের ইঞ্জিন ভালো কিন্তু কাগজ ভুয়া, সেই বাইক মাগনা দিলেও নিবেন না! রাস্তায় পুলিশ ধরলে সোজা জেলের ভাত খেতে হবে। তাহলে কীভাবে চেক করবেন?
বাইকের স্মার্ট কার্ড (Smart Card) বা ব্লু-বুকের সাথে বাইকের গায়ের ‘চেসিস নাম্বার’ (Chassis Number) এবং ‘ইঞ্জিন নাম্বার’ অক্ষরে অক্ষরে মিলিয়ে দেখুন। চেসিস নাম্বার সাধারণত বাইকের সামনের হ্যান্ডেলের ঠিক নিচে খোদাই করা থাকে। যদি দেখেন সেখানে ঘষা মাজা বা ওয়েল্ডিং করার দাগ আছে, তবে বুঝবেন ডাল মে কুছ কালা হ্যায়!
মানে যার নামে বাইক, সে নিজে উপস্থিত না থাকলে বাইক কিনবেন না। কারণ মালিকের সাইন এবং ফিঙ্গারপ্রিন্ট ছাড়া আপনি বাইক নিজের নামে বদলি করতে পারবেন না।
২. সেকেন্ড হ্যান্ড বাইক ইঞ্জিন খোলা হয়েছে কিনা? (Engine Check) করুন
জানিই তো যে বাইকের প্রাণ হলো ইঞ্জিন। দালালরা সবসময় বলবে, ভাই, ইঞ্জিন একদম আনটাচ! কিন্তু আপনি কীভাবে বুঝবেন?
দেখুন বাইকের ইঞ্জিনের চারপাশের নাট-বোল্টগুলোর দিকে খুব ভালো করে তাকান। যদি কোনো নাট খোলার জন্য রেঞ্জ বা ডালি ব্যাবহার করা হয়, তবে নাটের মাথায় সিলভার কালারের দাগ বা স্ক্র্যাচ পড়ে যাবে। এছাড়া ইঞ্জিনের জয়েন্টগুলোতে আঠা বা গামের দাগ দেখলে ১০০% নিশ্চিত হবেন যে ইঞ্জিন খোলা হয়েছে বা কাজ করানো হয়েছে।
৩. কোল্ড স্টার্ট এবং সাইলেন্সারের ধোঁয়া (Smoke Test)
কখনোই বিক্রেতার স্টার্ট করে রাখা গরম বাইক চেক করবেন না। বাইক কেনার জন্য এমন সময় যাবেন যখন বাইকটি অন্তত ৪-৫ ঘণ্টা বন্ধ ছিল। মানে ঠান্ডা ইঞ্জিন এ স্টার্ট করে দেখবেন।
এবার ঠান্ডা বাইকটি স্টার্ট দিন। স্টার্ট দেওয়ার পর ইঞ্জিনের শব্দ মনোযোগ দিয়ে শুনুন। কোনো কট কট বা ঝনঝন শব্দ আসছে কিনা খেয়াল করুন। এরপর সাইলেন্সারের পাইপের দিকে তাকান। যদি দেখেন সাদা বা কালো ধোঁয়া বের হচ্ছে, তবে সোজা হিসাব এই পুরাতন বাইকের পিস্টন বা রিংয়ের কাজ করাতে হবে, যা অনেক খরচের ব্যাপার। সাইলেন্সারের ভেতরে আঙুল দিয়ে দেখুন, যদি আঙুলে কালো কাঁচা মবিল লেগে যায়, তবে ওই বাইক কেনা থেকে দূরে থাকুন। মানে অনেক ভেজাল আছে এটাতে।
৪. অ্যাক্সিডেন্ট হিস্ট্রি ও চেসিস অ্যালাইনমেন্ট
বাইক অ্যাক্সিডেন্ট করেছে কিনা সেটা দালালরা খুব সুন্দর করে লুকিয়ে ফেলে নতুন পার্টস লাগিয়ে। বঝেনই তো তাই না?
-
কীভাবে চেক করবেন? বাইকটি মেইন স্ট্যান্ড করে হ্যান্ডেলটি সোজা করুন। এবার বাইকের একদম পেছন থেকে সামনের দিকে তাকান। চাকা এবং হ্যান্ডেল একদম সোজা এক লাইনে আছে কিনা খেয়াল করুন। আবার সামনে থেকেও সেম ভাবে পেছন দিকে তাকান সাজা নানি কোনো বাঁকা?
-
একটু ফাঁকা রাস্তায় বাইকটি চালিয়ে দেখুন। ২০-৩০ স্পিডে যাওয়ার সময় খুব সাবধানে ২ সেকেন্ডের জন্য হাত ছেড়ে দিন। বাইক যদি একপাশে হেলে যায় বা টান মারে, তবে বুঝবেন বাইক বড় কোনো অ্যাক্সিডেন্ট করেছিল এবং চেসিস বাঁকা হয়ে গেছে।
৫. সাসপেনশন, টায়ার এবং চেইন স্প্রোকেট (Hardware Check)
এই ছোট জিনিসগুলো নষ্ট থাকলে কেনার পরপরই আপনাকে ৫-৭ হাজার টাকা গচ্চা দিতে হবে নিশ্চত।
সামনের চাকায় ব্রেক চেপে হ্যান্ডেল ধরে জোরে কয়েকবার নিচের দিকে চাপ দিন (সাসপেনশন চেক)। এরপর সাসপেনশনের রডে হাত দিয়ে দেখুন কোনো তেল (Oil) লিক করেছে কিনা। লিক থাকলে অয়েল সিল পাল্টাতে হবে।
চেইন স্প্রোকেট বা পেছনের চাকার দাঁতগুলোর দিকে তাকান। দাঁতগুলো যদি একদম সুঁচালো বা হাঙরের দাঁতের মতো হয়ে যায়, তবে বুঝতে হবে চেইন স্প্রোকেট সেট এখনই বদলাতে হবে।
আমার প্রিয় শেষ কথা
ভাই, বাইক কেনা অনেক আবেগের একটা বিষয়। কিন্তু আবেগের বশে পলিশ করা চকচকে রং দেখে ভুল করবেন না। বাইক কেনার সময় অবশ্যই আপনার পরিচিত ভালো কোনো মেকানিক বা এক্সপার্ট বড় ভাইকে সাথে নিয়ে যাবেন। তারা ইঞ্জিন সাউন্ড শুনলেই অর্ধেক রোগ ধরে ফেলতে পারে।
আশা করি পুরাতন মোটরসাইকেল কেনার আগে কী কী চেক করতে হয়, তার এই বিস্তারিত গাইডলাইনটি আপনাদের অনেক বড় উপকারে আসবে। আপনি কি কখনো সেকেন্ড হ্যান্ড বাইক কিনে ধরা খেয়েছেন? আপনার অভিজ্ঞতা নিচে কমেন্ট বক্সে শেয়ার করুন, যাতে অন্য বাইকার ভাইরাও সতর্ক হতে পারে।
আপনাদের সঠিক তথ্য দিয়ে সাহায্য করাই আমার প্রিয় ডট কম-এর মূল উদ্দেশ্য। এমনই সব দরকারি এবং সময়োপযোগী টিপস পেতে নিয়মিত ভিজিট করুন আমাদের সাইটে। ভালো থাকবেন, আর বাইক চালানোর সময় অবশ্যই হেলমেট পরবেন! খোদা হাফেজ।
FAQ:
প্রশ্ন ১: পুরাতন বাইক নিজের নামে ট্রান্সফার (Name Transfer) করতে কত টাকা লাগে?
উত্তর: ২০২৬ সালের বিআরটিএ (BRTA) নিয়ম অনুযায়ী, মালিকানা বদলির জন্য সিসি (CC) ভেদে সরকারি ফি সাধারণত ৩,৫০০ থেকে ৫,০০০ টাকার মতো হয়ে থাকে। তবে দালাল ধরলে এই খরচ আরও অনেক বেড়ে যায়।
প্রশ্ন ২: বাইকের ট্যাক্স টোকেন (Tax Token) মেয়াদোত্তীর্ণ থাকলে কি বাইক কেনা যাবে?
উত্তর: কেনা যাবে, তবে ওই ট্যাক্স টোকেন রিনিউ করতে বা আপডেট করতে যে জরিমানা ও ফি আসবে, সেটা বাইকের মূল দাম থেকে বিক্রেতার সাথে কথা বলে কমিয়ে নিবেন।
প্রশ্ন ৩: চোরাই বাইক চেক করার কি অনলাইনে কোনো উপায় আছে?
উত্তর: সবচেয়ে ভালো উপায় হলো BRTA-এর কাছে গিয়ে রেজিস্ট্রেশন নাম্বার যাচাই করা। এছাড়া পুলিশের কোনো পরিচিত কর্মকর্তা থাকলে ইঞ্জিন ও চেসিস নাম্বার দিয়ে চেক করিয়ে নিতে পারেন যে ওই বাইকের নামে কোনো চুরি বা জিডি (GD) এন্ট্রি করা আছে কিনা।


