ছাদে এবং বাগানে বস্তায় আদা চাষ পদ্ধতি, মাটি তৈরি ও বীজ রোপণ।

কিভাবে বস্তায় আদা চাষ করবেন এবং সফল চাষির পদ্ধতি  A to Z

আপনি কি আদা চাষ করতে চাচ্ছেন?  তাহলে আজকের আর্টিকেলটা আপনার জন্য। বর্তমানে বাংলাদেশ সহ বিশ্বের প্রায় প্রত্যেকটা দেশেই আদার চাহিদা অনেক। বাজারে আদার অনেক চাহিদা থাকার কারণে বস্তায় আদা চাষ করে অনেকেই ব্যাপকভাবে লাভবান হচ্ছে। চাইলে আপনিও সঠিক পদ্ধতি ব্যবহার করে বস্তায় আদা চাষ করে লাভবান হতে পারেন।

বস্তায় আদা চাষ নিয়ে অনেকের মনে বিভিন্ন রকম প্রশ্ন ঘুরপাক খায়। আজকের আর্টিকেলটি পড়ে আশা করি আপনাদের সকল প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবেন।

বস্তায় আদা চাষ সম্পর্কিত আজকের আলোচনা

  • বস্তায় আদা চাষ করবেন কেন?
  • আদা চাষের জন্য কি রকমের বস্তা নির্বাচন করতে হবে?
  • বস্তায় আদা চাষের মাটি কিভাবে প্রস্তুত করতে হবে?
  • বস্তায় আদা চাষের জন্য কি রকম বীজ  নির্বাচন করতে হবে?
  • আদায় কি কি রোগ বালাই হয়ে থাকে?
  • বস্তায় আদা বীজ রোপন এর সঠিক সময় কখন?
  • আদা সংগ্রহের সঠিক সময় কখন?
  • বস্তায় আদা চাষ করলে কি পরিমান খরচ হতে পারে?
  • বস্তায় আদা চাষ করে কি সত্যি লাভবান হওয়া যাবে?

এই বিষয়গুলো সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা থাকবে এই আর্টিকেলটিতে। তাই সম্পূর্ণ আর্টিকেলটি পড়ার অনুরোধ রইল।

বস্তায় আদা চাষের উপকারিতা

আদা চাষ করতে সাধারণত অন্যান্য ফসলের তুলনায় অনেক সময় লাগে। তাই আদা জমিতে চাষ করলে জমিতে দীর্ঘদিন একটাই ফসল থাকবে। আর এই সময়ের মধ্যে জমিতে অন্যান্য ফসল উৎপাদন করে এর থেকে বেশি টাকা ইনকাম করা যাবে।

আমরা যদি বস্তায় আদা চাষ করি তাহলে যেসব জায়গা অন্যান্য ফসল চাষযোগ্য নয় যেমন – বাড়ির ছাদ, বাড়ির আঙিনা, বাগান পুকুরের পাড় এবং অনাবাদি জমিতে আদা চাষ করতে পারব।

এছাড়াও বস্তায় আদা চাষ করলে মাটিতে আদা চাষের তুলনায় খরচ কম হবে, সার বিষ  কম লাগবে,রোগ বালাই কম হবে,আগাছা জন্মাবে না, একবার পানি সেচ দিলে দীর্ঘদিন সেচ দিতে হবে না।

আবার প্রয়োজন হলে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে সরানো যাবে। আর এই জন্যই মাটিতে আদা চাষের তুলনায় বস্তায় আদা চাষের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে।

বস্তায় আদা চাষের জন্য সঠিক  বস্তা নির্বাচন

বস্তায় আদা চাষের জন্য উপযুক্ত বস্তা নির্বাচন করা অত্যন্ত প্রয়োজন। সঠিক বস্তা নির্বাচন না করতে পারলে সঠিক ফলন পাওয়া সম্ভব না।

সাধারণত বস্তায় আদা চাষের জন্য সিমেন্টের বস্তা, ফিডের বস্তা অথবা সারের বস্তা ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তবে এসব বস্তা শুধুমাত্র একবার ব্যবহার করলে দ্বিতীয়বার ব্যবহার করা যায় না।

এমন বস্তা নির্বাচন করতে হবে যাতে ২০ থেকে ২৫ কেজি মাটি রাখার পরেও 2 ইঞ্চি ফাঁকা থাকে। এতে করে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানি দেওয়া যাবে এবং পানি দেওয়ার সময় অতিরিক্ত পানি হলে তা বের করে দেয়া যাবে।

তবে আপনারা চাইলে জিও ব্যাগ ব্যবহার করতে পারেন। সেক্ষেত্রে তুলনামূলক  খরচ একটু বেশি হবে। কিন্তু দীর্ঘদিন ব্যবহার করতে পারবেন ।

বস্তায় আদা চাষের জন্য মাটি প্রস্তুতকরণ

আদা সাধারনত বেলে দশ মাটিতে ভালো জন্মায়। তবে মাটি পরীক্ষা করে তাতে প্রয়োজনীয় উপকরণ ব্যবহার করলে সব ধরনের মাটিতেই আদা চাষ করা যায়।

আদা চাষের জন্য মাটি প্রস্তুত করাটা অপরিহার্য। কারণ সঠিক নিয়মে মাটি প্রস্তুত না করলে আদা চাষ করে আশানুরূপ ফলন পাওয়া সম্ভব না।

বস্তায় আদা চাষের জন্য প্রতি বস্তায় যেসব উপকরণ মিশাতে হবে

মাটি ১০ থেকে ১৫ কেজি

গবর সার ৫ থেকে ৬ কেজি

ছাই ১ থেকে ২ কেজি

নিমের খোল ১০ গ্রাম

সরিষার খোল ১০ গ্রাম

টিএসপি ২০ গ্রাম

এমওপি ১০ গ্রাম

জিংক ৫ গ্রাম

দানাদার কীটনাশক ৫ গ্রাম

উপরোক্ত উপকরণ গুলো ভালো করে মিশিয়ে ১০ থেকে ১৫ দিন রেখে দিতে হবে। যেন মাটির কার্যকারিতা বৃদ্ধি পায়। এরপর বীজ রোপন করতে হবে।

 আদার  বীজ প্রস্তুতকরণ

বস্তায় আদা চাষের জন্য অবশ্যই উন্নত মানের বীজ নির্বাচন করতে হবে। কারণ উন্নত মানের বীজ নির্বাচন না করলে তা পচে যাওয়া ও ফলন কম হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

বীজ সংগ্রহের পর অবশ্যই তা প্রক্রিয়া তার সঠিক নিয়মে প্রক্রিয়াজাত করতে হবে। তা না করলে ছত্রাক দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে। এবং চারা গজানোর সম্ভাবনা কমে যায়।

বীজ সংগ্রহের পর তা ছোট আকারে কেটে তাতে ছত্রাকনাশক ব্যবহার করতে হবে। তা না হলে আদার কন্দ পচা রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

বস্তায় আদা চাষের বীজ রোপনের সময়

বস্তায় আদা চাষ ও মাটিতে চাষের জন্য  আদার বীজ রোপন  করার উপযুক্ত সময় হলো চৈত্র মাস থেকে বৈশাখ মাসের মাঝামাঝি সময়। এবং ইংরেজি মাস অনুযায়ী এপ্রিল মাস থেকে মে মাসের মাঝামাঝি সময় সাধারণত আদার বীজ রোপন করা হয়।

তবে এপ্রিলের শুরু থেকে এবং মে মাসের শেষ পর্যন্ত আদার বীজর রোপন করা যায়।  কোনো কারণবশত সঠিক সময়ে বিজরোপণ না করতে পারলেও ফাল্গুন মাসের দিকে আদার বিজরোপণ করা যায়।

আদা সংগ্রহের উপযুক্ত সময়

আদার বীজ রোপনের ৮ থেকে ১০ মাস পর অথবা ৩০০ থেকে ৩১৫ দিন পর থেকে আদা সংগ্রহ করা হয়।

সাধারণত জানুয়ারি মাস থেকে মার্চ মাসের মধ্যে আদা গাছের পাতা হলুদ হয়ে মরে যেতে শুরু করে।তখনই মূলত আদা বস্তা থেকে অথবা মাটি থেকে সংগ্রহ করা হয়।

আদার বিভিন্ন রোগবালায়

অন্যান্য ফসলের তুলনায় আদার রোগ বালাই অনেক কম হয়ে থাকে।

আদার সব থেকে বড় রোগ হলো আদার কন্দ  পচা রোগ। তবে রোপনের সময় ছত্রাকনাশক ব্যবহার করলে কন্দ  পচা রোগ থেকে ৮০% রক্ষা পাওয়া যায়।

তবে বর্ষাকালে অতিরিক্ত বৃষ্টি এবং ছায়াযুক্ত জায়গায় অতিরিক্ত পানি দেওয়ার ফলে দীর্ঘদিন ভেজা ভেজা ভাব থাকলে আদা কন্দ পচা রোগে আক্রান্ত হতে পারে। সেক্ষেত্রে কন্দপচা রোগের বালাইনাশক ব্যবহারের মাধ্যমে এ রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

এছাড়াও আদা গাছের পাতা হলুদ হওয়া রোগ এবং আদা গাছের পাতায় পোকা লাগতে পারে। তবে সঠিক কীটনাশক ও বালাইনাশক ব্যবহারের মাধ্যমে এসব রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

বস্তায় আদা চাষের খরচ ও লাভ

আসলে বস্তায় আদা চাষ করলে মাটিতে আদা চাষের তুলনায় খরচ অনেক কম। বিশ্বাস করে আগাছা নিংড়ানো এবং জমির লাগে না বললেই চলে। এবং তেমন কোন পরিচর্যারও প্রয়োজন হয় না।

বস্তায় আদা চাষ করলে প্রতি বস্তায় শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত  ৬০ থেকে ৭০ টাকা খরচ হতে পারে।

আশানুরূপ ফলন হলে প্রত্যেকটা বস্তা থেকে প্রায় ১ কেজি থেকে ১.৫ কেজি আদা পাওয়া যেতে পারে। বর্তমান বাজার অনুযায়ী সর্বনিম্ন দাম হিসাব করলেও প্রতিটা বস্তায় ২০০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত অথবা তার থেকে বেশি লাভ হতে পারে।

আমার প্রিয় কথা

বর্তমান বাজারে আদার অনেক চাহিদা আছে। এবং বাজারে  আদার দামও আছে তাই আদা বর্তমানে অনেক লাভজনক একটা ফসল হয়ে উঠেছে।

আমার মতে  বস্তায় আদা চাষ করলে যেহেতু অনাবাদি বা পড়ে থাকা জমি, বাগান, বাড়ি ছাদ আঙিনা ইত্যাদি জায়গায় চাষ করা যায়। সেহেতু একবার হলেও আদা আদা চাষ করে আপনি দেখতে পারেন।

আমার বিশ্বাস পড়ে থাকা জমি থেকে আপনি লাভবান একটি ফসল উৎপাদন করতে পারবেন।

আমাদের দেশে যেগুলো জমি অনাবাদি বা পড়ে আছে সেগুলো জমিতে আদা চাষ করলে আমরা নিজেরাও লাভবান হতে পারব ইনশাল্লাহ।  পাশাপাশি আমাদের দেশের চাহিদা মিটিয়ে বাইরের দেশে আদার রপ্তানি করা সম্ভব হতে পারে।

কৃষি সম্পর্কিত এরকম নতুন নতুন তথ্য পেতে আমার প্রিয় ডটকমের সাথেই থাকুন। এবং এর পূর্বে যদি আপনি আদা চাষ করে থাকেন তাহলে আপনার অভিজ্ঞতাটি কমেন্টের মাধ্যমে অন্যান্য চাষী বা নতুন উদ্যোক্তা  ভাইদের জানার সুযোগ করে দিন।

FAQ

প্রশ্ন: বস্তায় আদা চাষ করলে কোন জাতের আদা চাষ করলে ফলন বেশি পাওয়া যাবে?
উত্তর : আদা চাষ করলে উচ্চ ফলনশীল দুইটি জাত বারি আদা–১ ও বারি আদা–২ এই  জাতের আদা চাষ করতে পারেন।

প্রশ্ন : ছায়াযুক্ত জায়গায় কি আদা চাষ করা যায়?
উত্তর : হ্যাঁ। একটু পরিচর্যা করলে ছায়াযুক্ত জায়গায় বস্তাই করে আদা চাষ করা যায়।

 

×
Scroll to Top