হাম (Measles) আসলে নতুন কোনো রোগ নয়। গত কয়েক বছর ধরেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই রোগটি তার ভয়াবহ তাণ্ডব চালিয়ে আসছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত কয়েক বছরে বিশ্বে হামে আক্রান্ত হয়ে প্রায় ৯০ হাজার মানুষ মারা গেছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই ২০২৬ সালে এসে বাংলাদেশেও হাম ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। প্রতিটি ঘরে ঘরে, বিশেষ করে শিশুদের মাঝে এই রোগটি খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
বাবা-মা হিসেবে সন্তানের গায়ে জ্বর বা লাল র্যাশ (Rash) দেখলে ভয় পাওয়াটাই স্বাভাবিক। তাই আপনাদের দুশ্চিন্তা দূর করতে এবং শিশুদের এই ভয়াবহ হামের হাত থেকে বাঁচাতে আজকের এই আর্টিকেলে আমরা হাম রোগের লক্ষণ, চিকিৎসা এবং টিকা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করবো।
হাম কী এবং কীভাবে ছড়ায়?
হাম হলো অত্যন্ত ছোঁয়াচে একটি ভাইরাসজনিত রোগ। এটি বাতাসে বা সংক্রমিত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে খুব দ্রুত ছড়ায়। এক কথায়, সংক্রমিত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে বা তার ব্যবহৃত জিনিসপত্র ধরলে এই রোগ হওয়ার শতভাগ সম্ভাবনা থাকে।
গবেষকদের মতে, একজন হামে আক্রান্ত ব্যক্তি তার আশপাশের ১২ থেকে ১৮ জন সুস্থ মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে। যেহেতু এটি ছোঁয়াচে রোগ, তাই বিশেষজ্ঞদের মতে— হামে আক্রান্ত রোগীকে সাথে সাথে হোম কোয়ারেন্টাইনে বা আলাদা ঘরে রাখাই সবচেয়ে নিরাপদ।
হাম রোগের ঝুঁকি কাদের বেশি?
বর্তমানে বাংলাদেশে নবজাতক থেকে শুরু করে ১৫-১৬ বছর বয়সী শিশু-কিশোররাও হামে আক্রান্ত হচ্ছে। তবে যেসব শিশুর হাম সংক্রমনের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি, তারা হলো:
-
যেসব শিশু এখনো হামের টিকা গ্রহণ করেনি।
-
বিশেষ করে ১৫ মাসের কম বয়সী শিশু।
-
যারা টিকার প্রথম বা দ্বিতীয় ডোজ সম্পন্ন করেনি।
-
যাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immunity) কম।
-
যারা দীর্ঘদিন ধরে পুষ্টিহীনতা বা ভিটামিন-এ (Vitamin-A) এর অভাবে ভুগছে।
তবে যেসব শিশু মায়ের বুকের দুধ নিয়মিত পান করে, তাদের সংক্রমণের ঝুঁকি কিছুটা কম থাকে, কারণ তারা মায়ের শরীর থেকে সরাসরি অ্যান্টিবডি পেয়ে থাকে।
হাম শনাক্তকরণের উপায় (র্যাশ ওঠার আগেই বুঝবেন যেভাবে)
অনেকেই প্রশ্ন করেন, হাম কীভাবে শনাক্ত করা যায়? আমরা সাধারণত শরীরে ঘামাচির ন্যায় লাল ছোট ছোট দানা বা র্যাশ (Rash) দেখে বুঝি যে হাম হয়েছে। তবে মজার বিষয় হলো, এই র্যাশ ওঠার আগেই হাম শনাক্ত করা সম্ভব!
এ সম্পর্কে মেডিসিন বিশেষজ্ঞরা বলেন, শরীরে র্যাশ শুরু হওয়ার ২-৩ দিন আগে থেকেই কিছু প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যায়। যেমন:
-
শুরুতে প্রচণ্ড শুকনো কাশি হতে পারে।
-
নাক দিয়ে অনবরত পানি পড়া বা সর্দি-জ্বর হওয়া।
-
চোখ লালচে হয়ে যাওয়া এবং চোখ দিয়ে পানি পড়া।
-
জ্বরের সাথে সাথে গালের ভেতরের দিকে সাদাটে ছোট ছোট স্পট (Koplik spots) দেখা দিতে পারে।
হাম হলে করণীয় ও চিকিৎসা কী?
উপরে বলা লক্ষণগুলো দেখা দিলেই দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। সঠিক সময়ে চিকিৎসা না নিলে পরবর্তীতে এটি ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে।
-
বিশ্রাম ও খাবার: আক্রান্ত শিশুকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে রাখতে হবে। প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার (পানি, ডাবের পানি, ফলের রস) এবং পুষ্টিকর খাবার খাওয়াতে হবে।
-
ভিটামিন-এ: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী শিশুকে ভিটামিন-এ ক্যাপসুল খাওয়াতে হবে, যা হামের জটিলতা দ্রুত কমিয়ে আনে।
-
আলাদা রাখা: স্কুলগামী শিশুদের এসব লক্ষণ দেখা দিলে কোনোভাবেই স্কুলে পাঠানো যাবে না। সুস্থ শিশুদের থেকে তাকে আলাদা রাখতে হবে।
টিকা না নিলে কী ক্ষতি হতে পারে?
হামের টিকা না নেওয়া শিশুদের জন্য এই রোগটি মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। হাম থেকে পরবর্তীতে শিশুর নিউমোনিয়া (Pneumonia), ডায়রিয়া এবং ইয়ার ইনফেকশন (কানের ইনফেকশন) হতে পারে। সব থেকে ভয়াবহ দিক হলো, হামের কারণে ব্রেইন ইনফেকশন হতে পারে, যাকে ডাক্তারি ভাষায় ‘এনকেফালাইটিস’ (Encephalitis) বলা হয়। এটি শিশুর মৃত্যু পর্যন্ত ডেকে আনতে পারে।
টিকা নেওয়ার পরও কি হাম হতে পারে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের টিকা প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ কার্যকর। তবে কিছু ক্ষেত্রে (যেমন- শিশু যদি মারাত্মক অপুষ্টিতে ভোগে বা অন্য কোনো জটিল রোগ থাকে) টিকা নেয়ার পরও হাম হতে পারে। তবে খুশির খবর হলো, টিকা নেওয়া থাকলে হাম হলেও তার প্রভাব খুব সামান্য হয় এবং দ্রুত সেরে যায়।
হামের টিকা কখন দিতে হয়?
সরকারি সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (EPI) অনুযায়ী, শিশুকে ৯ মাস পূর্ণ হলে হামের প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ টিকা দেওয়া হয়। সঠিক সময়ে টিকা গ্রহণ না করলে হাম সংক্রমণের ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়।
(সতর্কতা: বাংলাদেশে হাম ছড়িয়ে পড়ায় সরকারের পক্ষ থেকে মাঝে মাঝেই বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের বিনামূল্যে হাম ও রুবেলার টিকা দেওয়া হয়। নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে খোঁজ রাখুন।)
আমার প্রিয় শেষ কথা
হামের এই দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে আমাদের সকলের নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। বাড়ির বাইরে গেলে মাস্ক ব্যবহার করা, হাত ধোয়া এবং আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখার মাধ্যমে আমরা এই রোগ প্রতিরোধ করতে পারি।
আশা করি, হাম রোগ নিয়ে লেখা এই বিস্তারিত গাইডলাইনটি আপনাদের অনেক উপকারে আসবে। আপনার শিশুর সুরক্ষায় কোনো অবহেলা করবেন না। এমন সব দরকারি ও স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক টিপস পেতে নিয়মিত চোখ রাখুন আমার প্রিয় ডট কম-এ।
(ডিসক্লেইমার: এই আর্টিকেলে দেওয়া তথ্যগুলো সাধারণ সচেতনতার জন্য। যেকোনো শারীরিক জটিলতায় সরাসরি রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করুন।)
FAQ:
প্রশ্ন ১: হাম দ্বারা সংক্রমিত হলে কতদিন হোম কোয়ারেন্টাইনে বা আলাদা থাকতে হবে?
উত্তর: হামের লক্ষণ (জ্বর/সর্দি) দেখা দেওয়ার পর থেকে এবং শরীরে র্যাশ বা দানা ওঠার ৪-৫ দিন পর পর্যন্ত রোগীকে আলাদা বা হোম কোয়ারেন্টাইনে রাখতে হবে। এই সময়েই রোগটি সবচেয়ে বেশি ছড়ায়।
প্রশ্ন ২: হামের লক্ষণ দেখা দেওয়ার সাথে সাথেই কি হাসপাতালে ভর্তি হতে হবে?
উত্তর: সাধারণ সর্দি, জ্বর বা কাশির জন্য হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন নেই, ঘরে বসেই ডাক্তারের পরামর্শে চিকিৎসা নেওয়া যায়। তবে যদি শ্বাসকষ্ট হয়, অতিরিক্ত ডায়রিয়া হয়, বা খিঁচুনি শুরু হয়, তখন এক মুহূর্ত দেরি না করে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে।
প্রশ্ন ৩: বড়দের কি হাম হতে পারে?
উত্তর: হ্যাঁ, বড়দেরও হাম হতে পারে। বিশেষ করে যারা ছোটবেলায় হামের টিকা নেননি বা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তারা হাম আক্রান্ত ব্যক্তির সংস্পর্শে এলে সংক্রমিত হতে পারেন।


