টাকা খরচ করে খামার তৈরি করার পর যদি সঠিক খাবার বাছাই করা না যায়, তবে পুরো প্রজেক্টটাই লস প্রজেক্টে পরিণত হতে পারে। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের পোল্ট্রি, ডেইরি এবং মৎস্য খামারিদের কাছে খুবই পরিচিত একটি কোম্পানির নাম হলো নারিশ ফিড (Nourish Feed)। আমি যখন নতুন খামার শুরু করেছিলাম, তখন সঠিক নিয়মে নারিশ ফিড ব্যবহার না জেনে বেশ বড়সড় লসের মুখ দেখতে বসেছিলাম। তাই ভালো লাভ করতে হলে আমার নিজের অভিজ্ঞতা কী বলে, সেটি জানা ভীষণ জরুরি।
আজকের এই কমপ্লিট গাইডে আমি একদম সহজ ভাষায় নিজের অভিজ্ঞতা থেকে শেয়ার করবো নারিশ ফিডের কাজ কী, এটি খাওয়ালে আমার খামারে কী লাভ হয়েছে,
কোম্পানির ডিলারদের সাথে আমি কীভাবে যোগাযোগ করি এবং ২০২৬ সালের লেটেস্ট আপডেট তথ্যগুলো। চলুন কোনো জটিল কথায় না গিয়ে সরাসরি মূল আলোচনায় যাওয়া যাক।
নারিশ ফিডের উপকারিতা
খামারের পশু-পাখির দ্রুত বৃদ্ধির জন্য পুষ্টিকর খাবারের কোনো বিকল্প নেই বলেই আমি মনে করি।
আমার খামারে নারিশ ফিডের সবচেয়ে বড় উপকারিতা যেটা দেখেছি, তা হলো এর সঠিক পুষ্টির ভারসাম্য।
এই খাবারে ভিটামিন, মিনারেল এবং প্রোটিনের অনুপাত এমনভাবে রাখা হয় যাতে আমার পশুপাখি সহজে হজম করতে পারে।
-
দ্রুত শারীরিক বৃদ্ধি: এটি খাওয়ানোর পর আমার ব্রয়লার মুরগি বা মাছ খুব কম সময়ে আশানুরূপ ওজনে চলে এসেছে।
-
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি: খাবারের থাকা বিশেষ উপাদান পশুপাখির ভেতরের ইমিউনিটি বাড়ায়, ফলে আমার খামারে রোগবালাই অনেক কমে গেছে।
-
খাবারের অপচয় রোধ: এদের ফিডের মান উন্নত হওয়ায় আমার পশুপাখি খাবার নষ্ট কম করে, যা আমার পকেটের খরচ অনেক বাঁচিয়ে দেয়।
নারিশ ফিড খাওয়ালে কি হয়
আমার মনেও একসময় প্রশ্ন ছিল যে এই ফিড টানা খাওয়ালে কোনো ক্ষতি হবে কি না বা আসলে কী ঘটে।
বাংলা কথায়, নারিশ ফিড খাওয়ানোর পর আমি দেখেছি পশুপাখির মেটাবলিজম রেট বা হজম প্রক্রিয়া খুব ভালো থাকে।
মুরগির ক্ষেত্রে আমি লক্ষ্য করেছি মাংসের কোয়ালিটি দারুণ হয় এবং ডিম পাড়া মুরগির ডিমের খোসা বেশ শক্ত হয়।
মাছের ক্ষেত্রে পানির গুণগত মান নষ্ট না করেই মাছ দ্রুত বড় হতে সাহায্য করে।
তবে আমি মনে রাখি, অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো না, পরিমাপ মতো খাওয়ালেই সেরা রেজাল্ট পাওয়া যায়।
নারিশ ফিড কত প্রকার
আমার নিজের বিভিন্ন প্রজেক্টের চাহিদা এবং পশুপাখির বয়স অনুযায়ী নারিশ ফিডকে কয়েক ভাগে ভাগ করে আমি ব্যবহার করি। মূলত ৩টি প্রধান সেক্টরে এদের ফিড আমি পেয়েছি:
-
পোল্ট্রি ফিড (Poultry Feed): এর মধ্যে আমি ব্যবহার করি ব্রয়লার স্টার্টার, গ্রোয়ার, ফিনিশার এবং লেয়ার বা সোনালী মুরগির জন্য বিশেষ খাবার।
-
ফিশ ফিড (Fish Feed): ডুবন্ত (Sinking) এবং ভাসমান (Floating) দুই ধরনের মাছের খাবারই আমি আমার পুকুরে ব্যবহার করি। শিং, মাগুর, তেলাপিয়া বা কার্প জাতীয় মাছের জন্য আলাদা সাইজের দানা থাকে।
-
ক্যাটেল ফিড (Cattle Feed): আমার ডেইরি ফার্মের গাভী বা দুধের গরুর জন্য এবং মোটাতাজাকরণ প্রজেক্টের গরুর জন্য আলাদা ফিড পাওয়া যায়।
নারিশ ফিড ছাগলের জন্য
সাধারণত বাজারে ছাগলের জন্য সরাসরি নারিশ ফিড কোম্পানির স্পেশাল ফিড আমি খুব একটা দেখিনি।
তবে নারিশের ক্যাটেল ফিড বা গরুর বাড়ন্ত বাছুরের জন্য তৈরি খাবারটি আমার ছাগলগুলোকে অল্প পরিমাণে দিয়ে বেশ ভালো ফল পেয়েছিলাম ।
ছাগলকে নারিশ ফিড খাওয়ালে তাদের শরীরের পুষ্টির ঘাটতি দ্রুত পূরণ হয় বলে আমি লক্ষ্য করেছিলাম।
তবে আমি সবসময় মনে রাখি, ছাগল মূলত ঘাস এবং লতাপাতা খেতে পছন্দ করে।
তাই সম্পূর্ণ দানাদার খাবারের ওপর নির্ভর না করে, প্রাকৃতিক ঘাসের পাশাপাশি সাপ্লিমেন্ট হিসেবে আমি নারিশের ফিড দিই, এটাই আমার বুদ্ধিমানের কাজ হয়েছে।
নারিশ ফিডের অল্টারনেটিভ
বাজারে শুধু নারিশ নয়, আরও বেশ কিছু নামকরা ব্র্যান্ড আছে যেগুলোকে আমি মাঝে মাঝে নারিশ ফিডের অল্টারনেটিভ বা বিকল্প হিসেবে ট্রাই করে দেখেছি।
আমার এলাকায় নারিশের সাপ্লাই কম থাকলে, আমি যে সমস্ত ব্র্যান্ডগুলো ব্যাকআপ হিসেবে রাখি:
-
কাজী ফার্মস ফিড (Kazi Farms Feed)
-
সিপি ফিড (CP Feed)
-
কোয়ালিটি ফিড (Quality Feeds)
-
আফতাব ফিড (Aftab Feed)
আমার খামারের টিপস: আমি হুট করে একদিনেই এক ব্র্যান্ডের খাবার বাদ দিয়ে অন্য ব্র্যান্ডের খাবার পুরোপুরি দেওয়া শুরু করি না।
এতে আমার পশুপাখির পেটের সমস্যা হতে পারে। আমি সবসময় পুরোনো খাবারের সাথে নতুন খাবার অল্প অল্প করে মিশিয়ে অভ্যাস করাই।
নারিশ ফিড মাছের জন্য
মাছ চাষে আমার লাভের মূল চাবিকাঠি হলো সঠিক সময়ে সঠিক আকারের খাবার দেওয়া।
আমি দেখেছি নারিশ ফিশ ফিড মাছের প্রজাতি ভেদে পাউডার (মেস), ক্রাম্বল এবং পেলেট আকারে পাওয়া যায়।
বিশেষ করে তাদের ভাসমান খাবারগুলো আমার পুকুরের পানির ওপর দীর্ঘক্ষণ ভেসে থাকে, যার ফলে আমার মাছগুলো সহজে খেতে পারে এবং পুকুরের তলার পরিবেশ একদম নষ্ট হয় না।
পাঙ্গাশ, তেলাপিয়া এবং কার্প জাতীয় মাছের জন্য এই ফিড আমার কাছে অত্যন্ত কার্যকর মনে হয়েছে।
নারিশ ফিড গরুর জন্য
দুধের খামার কিংবা কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে গরু মোটাতাজাকরণ—উভয় ক্ষেত্রেই আমি নারিশ ক্যাটেল ফিড ব্যবহার করে দারুণ উপকার পেয়েছি।
এতে থাকা ক্যালসিয়াম এবং ফসফরাস আমার গরুর হাড় মজবুত করে এবং দুধের উৎপাদন ক্ষমতা স্বাভাবিক রাখে।
আমি সবসময় শুকনো খড় এবং কাঁচা ঘাসের সাথে দৈনিক নির্দিষ্ট মাপে এই ফিড খাওয়াই, এতে গরুর স্বাস্থ্য দ্রুত ঠিক হয়ে যায়।
নারিশ ফিড কি দিয়ে বানানো হয়
আমি যখন খামার শুরু করি, তখন ল্যাবে গিয়ে খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম যে এগুলো আসলে কীভাবে তৈরি হয়।
কিন্তু পারিনি কারণ এটি সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক উপায়ে ল্যাবরেটরিতে টেস্ট করার পর তৈরি করা হয়। তবে মূল উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে:
-
ভুট্টা ভাঙা ও গমের ভুসি
-
সয়াবিন মিল (Soybean Meal)
-
রাইস পলিশ বা চালের কুঁড়া
-
মাছের গুঁড়ো বা ফিশ মিল
-
প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও মিনারেল প্রিমিক্স
এসব উপাদান একসঙ্গে মিক্স করে মেশিনের সাহায্যে ছোট ছোট দানা বা পেলেট তৈরি করা হয়, যা আমার খামারের পশুপাখির পুষ্টির চাহিদা মেটায়।
নারিশ ফিডের মেয়াদ কিভাবে নির্ধারণ হয়
আমি যেকোনো ফিড কেনার আগে তার এক্সপায়ারি ডেট বা মেয়াদ দেখে নেওয়া ফরজ মনে করি।
নারিশ ফিডের প্রতিটি বস্তার গায়ে উৎপাদনের তারিখ এবং ব্যাচ নাম্বার সিল মারা থাকে, যা আমি সবসময় মিলিয়ে নিই।
সাধারণত উৎপাদনের তারিখ থেকে ৩ মাস (৯০ দিন) পর্যন্ত এই ফিডের মেয়াদ থাকে।
তবে আমি যদি খাবার স্যাঁতসেঁতে জায়গায় রাখি বা বাতাস ঢোকে, তবে মেয়াদের আগেই নষ্ট বা ছত্রাক পড়ে যেতে পারে।
তাই আমি সবসময় শুকনো ও হাওয়া চলাচল করে এমন জায়গায় বস্তা রাখি।
নারিশ ফিড কোম্পানির মালিকের নাম কি
আমার মনেও একসময় কৌতুহল ছিল যে এই বিশাল কোম্পানির পেছনে কে আছেন, যাদের খাবার আমি নিয়মিত কিনি।
নারিশ পোল্ট্রি এন্ড হ্যাচারি লিমিটেড (Nourish Poultry & Hatchery Ltd.) হলো বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ করপোরেট গ্রুপ কেএইচবি গ্রুপ (KHB Group) এর একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠান।
এর মূল উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের যৌথ নেতৃত্বে কোম্পানিটি পরিচালিত হয়ে আসছে।
নারিশ ফিড কোম্পানি কোথায় অবস্থিত
আমি খোঁজ নিয়ে জেনেছি, কোম্পানির রেজিস্টার্ড কর্পোরেট অফিস বা হেড কোয়ার্টার ঢাকা শহরে অবস্থিত।
তবে আমার সুবিধার্থে এবং দেশের সব প্রান্তের মানুষের জন্য এদের প্রধান উৎপাদন কারখানা বা ফিড মিলগুলো দেশের বিভিন্ন কৌশলগত এলাকায় স্থাপন করা হয়েছে,
যাতে সহজে সারা দেশে খাবার সরবরাহ করা যায়। বিশেষ করে গাজীপুর ও সংলগ্ন এলাকায় এদের বড় প্রজেক্ট রয়েছে, যেখান থেকে আমি সরাসরি গাড়ি লোড দিয়ে থাকি।
নারিশ ফিডের ডিলার লিস্ট
আমি সবসময় সরাসরি কম দামে এবং আসল পণ্য পেতে অফিশিয়াল ডিলারের কাছ থেকে খাবার কিনি। নারিশের বাংলাদেশের ৬৪টি জেলাতেই ডিলার নেটওয়ার্ক রয়েছে।
আমি যে সমস্ত প্রধান ডিলার পয়েন্টগুলোর খোঁজ রাখি, তার একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো। তবে নিকটস্থ ডিলারের সঠিক তথ্য জানতে আমি মাঝে মাঝে তাদের কাস্টমার কেয়ারেও কথা বলে নিই।
| বিভাগ | প্রধান ডিলার পয়েন্ট বা এলাকা |
| ঢাকা | গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, টাঙ্গাইল |
| চট্টগ্রাম | পটিয়া, ফেনী, কুমিল্লা, চৌমুহনী, কক্সবাজার |
| রাজশাহী | বগুড়া, নাটোর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ |
| খুলনা | যশোর, ঝিনাইদহ, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা |
| ময়মনসিংহ | ভালুকা, শেরপুর, নেত্রকোনা |
নারিশ ফিডের ডিলার এলাকা
সাধারণত যে সমস্ত এলাকায় খামারের সংখ্যা বেশি—যেমন আমার চেনা জানার মধ্যে গাজীপুরের শ্রীপুর, ময়মনসিংহের ভালুকা, বগুড়ার শেরপুর
কিংবা নাটোরের চলনবিল সংলগ্ন এলাকা সেসব জায়গায় আমি নারিশের একাধিক বড় বড় ডিলার পয়েন্ট বা সাব-ডিলার আছে শুনেছি ।
আমার এলাকায় যখন বড় ডিলার ছিলোনা , তখন আমি জেলা সদরের বাজারের ফিড পট্টিতে খোঁজ নিতাম , সেখানে সহজেই নারিশের সাইনবোর্ড পেয়ে যেতাম।
নারিশ ফিডের ডিলার ম্যাপ
আমি যখন কোনো নতুন এলাকায় ডিলারের সন্ধান করি, তখন সরাসরি গুগল ম্যাপে গিয়ে “Nourish Feed Dealer Near Me” অথবা “Nourish Poultry & Hatchery” লিখে সার্চ করি।
এতে আমার বর্তমান লোকেশনের সবচেয়ে কাছে থাকা অফিশিয়াল দোকান বা শোরুমের লাইভ ম্যাপ ও লোকেশন আমি চোখের সামনে দেখতে পাই। ডিজিটাল যুগে আমার কাছে এটিই সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি মনে হয়।
নারিশ ফিড কোম্পানির নাম্বার
যেকোনো জরুরি জিজ্ঞাসা, ডিলারশিপ নেওয়া বা কমপ্লেনের জন্য আমি সরাসরি কোম্পানির হটলাইন নাম্বারে যোগাযোগ করি।
-
হটলাইন নাম্বার: +৮৮০২-২২২২৮৪৪৭৪ (এটি তাদের কর্পোরেট অফিসের সাধারণ যোগাযোগের নাম্বার, আমি সাধারণত কাজের দিনগুলোতে অফিস টাইমে ফোন দিয়ে থাকি)।
নারিশ ফিড কোম্পানির ঠিকানা
-
হেড অফিস: প্লট- লড়ডিন প্যালেস, হাউজ- ৪২, রোড- ১, ব্লক- এ, নিকেতন, গুলশান- ১, ঢাকা- ১২১২, বাংলাদেশ।
আমার বড় প্রজেক্টের জন্য যখন একবারে প্রচুর ফিড লাগে বা সরাসরি পাইকারি রেটে গাড়ি লোড দিতে চাই, তখন আমি এই ঠিকানায় যোগাযোগ করে সরাসরি বুকিং করি।
আমার প্রিয় কিছু কথা
খামার ব্যবসাটি কিন্তু পুরোপুরি ধৈর্যের। আমি নিজে কাজ করতে গিয়ে বুঝেছি, শুধু ভালো ফিড খাওয়ালেই হবে না, খামারের শেডের বায়োসিকিউরিটি বা পরিচ্ছন্নতা ঠিক রাখতে হবে।
আলো-বাতাসের ব্যবস্থা ভালো না হলে পৃথিবীর সবচেয়ে দামি খাবার খাওয়ালেও আমার পশুপাখি অসুস্থ হয়ে পড়বে।
তাই খাবারের পেছনে বিনিয়োগ করার পাশাপাশি আমি খামারের পরিবেশের দিকেও সমান নজর দিই। আশা করি আমার এই অভিজ্ঞতা আপনাদের খামারের সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।
FAQ
আমি কি সরাসরি কোম্পানি থেকে ফিড কিনতে পারি?
না!, সাধারণত কোম্পানি খুচরা বা ২-৪ বস্তা খাবার সরাসরি আমার কাছে বিক্রি করবে না। আমি কোম্পানির অনুমোদিত ডিলারের মাধ্যমে নিই।
ফিডের বস্তা নষ্ট বা ভেজা থাকলে কি করবো?
ডিলারের কাছ থেকে নেওয়ার সময় বস্তা ছেঁড়া বা সেলাই খোলা থাকলে আমি তা সাথে সাথে পরিবর্তন করে নিই।
২০২৬ সালে নারিশ ফিডের দাম কত?
বর্তমান সঠিক রেট জানতে আমি আমার স্থানীয় ডিলারের দোকানে সরাসরি যোগাযোগ করাকেই সেরা মাধ্যম মনে করি। তাছাড়া আমাদের এই পোস্ট টি পারেন


