আমাদের বর্তমান এই যান্ত্রিক জীবনে আমরা সবাই যেন কেমন একটা ইঁদুর দৌড়ে মেতে আছি। সারাদিন কাজ, টেনশন, স্ট্রেস, ক্যারিয়ার নিয়ে চিন্তা, পরিবার নিয়ে চিন্তা— সব মিলিয়ে দিন শেষে আমাদের মনে আর কোনো শান্তি থাকে না। অনেকেই রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারেন না, ডিপ্রেশনে ভোগেন। কিন্তু আপনি কি জানেন, এই সব মানসিক অশান্তি আর দুনিয়ার যাবতীয় সমস্যার একটা দারুন সমাধান আমাদের ইসলাম ধর্মে দেওয়া আছে? হ্যাঁ বন্ধুরা, আমি কথা বলছি রাতের বেলার এক বিশেষ ইবাদত নিয়ে, যার নাম হলো তাহাজ্জুদ।
আজকে আমি আপনাদের সাথে এমন একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো, যা আমার নিজের জীবনকে অনেক গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। আমি নিজে একসময় অনেক হতাশায় ভুগতাম, কিন্তু যখন থেকে তাহাজ্জুদের সাথে আমার পরিচয় হলো, আমার জীবনের মোড় ঘুরে গেলো। আজকে আমি আপনাদের সাথে বিস্তারিত শেয়ার করবো তাহাজ্জুদ নামাজের নিয়ম, এটি কখন পড়তে হয়, এর ফজিলত কী এবং কিভাবে আপনি খুব সহজেই এই নামাজটি আপনার দৈনন্দিন জীবনের অংশ করে নিতে পারবেন। এই লেখাটি একটু বড় হবে, কারণ আমি চাই আপনারা যেন এই একটি আর্টিকেল থেকেই সব কিছু ক্লিয়ারভাবে বুঝতে পারেন। তাই ধৈর্য ধরে পুরোটা পড়ার অনুরোধ রইলো।
তাহাজ্জুদ নামাজ কি? (What is Tahajjud Namaz)
অনেকেই আমাকে প্রশ্ন করেন, ভাই তাহাজ্জুদ নামাজ কি? খুব সাধারণ ভাষায় যদি বলি, ‘তাহাজ্জুদ’ শব্দটি আরবি শব্দ ‘হুজুদ’ থেকে এসেছে। এর অর্থ হলো ঘুম থেকে ওঠা বা রাত জাগরণ করা। ইসলামী পরিভাষায়, রাতের বেলায় এশার নামাজ পড়ার পর ঘুমিয়ে, রাতের শেষ ভাগে ঘুম থেকে উঠে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য যে নফল ইবাদত বা নামাজ আদায় করা হয়, তাকেই তাহাজ্জুদ নামাজ বলা হয়।
এটি ফরজ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের মতো বাধ্যতামূলক নয়, তবে এটি হলো শ্রেষ্ঠ নফল ইবাদত। স্বয়ং আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর জীবনে কখনো তাহাজ্জুদ নামাজ ছাড়েননি। এমনকি উম্মতের জন্য এটি নফল হলেও, রাসূল (সা.) এর ওপর একসময় এটি পড়া ফরজ ছিলো। আপনি যখন গভীর রাতে চারদিকে পিনপতন নীরবতা, সবাই যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, ঠিক তখন নিজের আরামের ঘুম হারাম করে জায়নামাজে দাঁড়িয়ে আল্লাহর সাথে কথা বলেন— এর চেয়ে সুন্দর অনুভূতি পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই। এই নামাজ হলো বান্দার সাথে আল্লাহর সরাসরি কানেকশন তৈরী করার সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম।
তাহাজ্জুদ নামাজ কেন পড়বেন? এর ফজিলত
এখন আপনাদের মনে প্রশ্ন আসতে পারে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ তো পড়ছিই, তাহলে আবার কষ্ট করে রাতের বেলা উঠে তাহাজ্জুদ নামাজ কেন পড়বো? এর উত্তর লুকিয়ে আছে কোরআন এবং হাদিসের পাতায় পাতায়।
তাহাজ্জুদ নামাজের ফজিলত বলে শেষ করা যাবে না। আমি এখানে কিছু গুরুত্বপূর্ণ ফজিলতের কথা শেয়ার করছি, যা জানলে আপনার মনে আজ রাতেই এই নামাজ পড়ার একটা অদম্য ইচ্ছা তৈরী হবে:
১. আল্লাহর সরাসরি নৈকট্য লাভ: হাদিস শরীফে এসেছে, রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আল্লাহ তায়ালা প্রথম আসমানে নেমে আসেন এবং বান্দাদের ডাক দিয়ে বলতে থাকেন, “কে আছো আমাকে ডাকবে, আমি তার ডাকে সাড়া দেবো? কে আছো আমার কাছে কিছু চাইবে, আমি তাকে তা দেবো? কে আছো আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করে দেবো?” (সহীহ বুখারী)। চিন্তা করে দেখুন, স্বয়ং আল্লাহ আপনাকে অফার করছেন চাওয়ার জন্য! এর চেয়ে বড় সুযোগ আর কি হতে পারে?
২. দোয়া কবুলের শ্রেষ্ঠ সময়: আমরা অনেক সময় বলি যে আমার দোয়া কবুল হচ্ছে না। কিন্তু তাহাজ্জুদের সময়টা হলো ‘মাকবুল’ সময়। এই সময়ে চোখের পানি ফেলে আপনি আল্লাহর কাছে যা-ই চাইবেন, আল্লাহ যদি সেটা আপনার জন্য কল্যাণকর মনে করেন, অবশই তা কবুল করবেন। কোনো বিপদ বা মুসিবতে পড়লে এই নামাজ পড়ে দোয়া করাটা সবচেয়ে বেশি কাজে দেয়।
আরো আছে..
৩. মানসিক প্রশান্তি ও রিযিক বৃদ্ধি: আমার নিজের এক্সপেরিয়েন্স থেকে বলি, যেদিন আমি তাহাজ্জুদ পড়ি, সারাদিন আমার মনটা অসম্ভব ফুরফুরে থাকে। কোনো কাজে ক্লান্তি আসে না। আল্লাহ তায়ালা তাহাজ্জুদ গুজার বান্দার রিযিকে বরকত দান করেন এবং তার চেহারাকে নূরানি করে দেন।
৪. জান্নাতের স্পেশাল দরজা: যারা নিয়মিত তাহাজ্জুদ পড়ে, কেয়ামতের দিন তাদের জন্য জান্নাতের বিশেষ দরজা খোলা থাকবে। কোরআনে সূরা আল-ফুরকানে আল্লাহ বলেছেন, আল্লাহর প্রিয় বান্দা তারাই যারা রাত কাটায় তাদের রবের উদ্দেশ্যে সিজদাবনত ও দণ্ডায়মান হয়ে।
তো বুঝতেই পারছেন, দুনিয়া ও আখিরাতের সফলতার জন্য এই একটি মাত্র নফল ইবাদত কতটা দড়কার। তাই আমাদের সবার উচিৎ অন্তত মাঝে মাঝে হলেও এই নামাজ পড়ার চেষ্টা করা।
তাহাজ্জুদ নামাজের সময়সূচি – কখন তাহাজ্জুদ পড়তে হয়?
অনেকেই তাহাজ্জুদ নামাজের সময়সূচি নিয়ে বেশ কনফিউশনে থাকেন। গুগলে প্রচুর মানুষ সার্চ করে জানতে চান— কখন তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ার সঠিক সময়?
সহজ কথায়, এশার নামাজের পর থেকে সুবহে সাদিক (ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত) রাতের যেকোনো সময় তাহাজ্জুদ নামাজ পড়া যায়। তবে শর্ত হলো, এশার নামাজের পর আপনাকে অবশই কিছুটা সময় ঘুমাতে হবে। ঘুম থেকে উঠে পড়াটাই হলো সুন্নাহ।
তবে রাতের শ্রেষ্ঠ সময় হলো রাতের শেষ তৃতীয়াংশ। এটা কিভাবে হিসাব করবেন? ধরুন, মাগরিবের আজান হয় সন্ধ্যা ৬টায় এবং ফজরের আজান হয় ভোর ৫টায়। তাহলে রাতের মোট সময় হলো ১১ ঘণ্টা। এই ১১ ঘণ্টাকে তিন ভাগ করলে প্রতি ভাগে প্রায় ৩ ঘণ্টা ৪০ মিনিট পড়ে। অর্থাৎ, রাত ১টা ২০ মিনিটের পর থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত হলো রাতের শেষ তৃতীয়াংশ। এই সময়টাতেই তাহাজ্জুদ পড়া সবচেয়ে উত্তম।
আমাদের দেশে সাধারণত রাত ৩টা থেকে ফজরের আজানের আগ পর্যন্ত সময়কে তাহাজ্জুদ পড়ার জন্য সবচেয়ে পারফেক্ট সময় হিসেবে ধরা হয়। আপনি চাইলে অ্যালার্ম দিয়ে ঠিক ফজর শুরুর আধা ঘণ্টা আগেও উঠতে পারেন। উঠে সুন্দর করে ওযু করে ২ বা ৪ রাকাত তাহাজ্জুদ পড়ে নিতে পারেন।
তাহাজ্জুদ নামাজ কিভাবে পড়তে হয়? – তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ার নিয়ম
এবার আসি মূল পয়েন্টে। তাহাজ্জুদ নামাজ কিভাবে পড়তে হয় বা এর নিয়ম কী? অনেকেই ভাবেন এই নামাজের হয়তো আলাদা কোনো নিয়ম বা বিশেষ কোনো সূরা আছে। আসলে বিষয়টা মোটেও জটিল কিছু নয়। অন্য সব নফল নামাজের মতোই এটি পড়তে হয়। তবে আমি আপনাদের সুবিধার্থে স্টেপ বাই স্টেপ নিয়মগুলো নিচে তুলে ধরছি:
১. ঘুম থেকে ওঠা ও প্রস্তুতি: প্রথমে অ্যালার্ম শুনে ঘুম থেকে উঠুন। ঘুম থেকে ওঠার দোয়া (“আলহামদু লিল্লাহিল্লাজি আহয়ানা বা’দা মা আমাতানা ওয়া ইলাইহিন নুশুর”) পড়ে নিন। এরপর ফ্রেশ হয়ে খুব সুন্দরভাবে ধীরে সুস্থে ওযু করুন।
২. জায়নামাজে দাঁড়ানো: ঘরের এমন একটি পবিত্র জায়গা বেছে নিন যেখানে কেউ আপনাকে ডিস্টার্ব করবে না। একটু অন্ধকার বা কম আলো হলে মনোযোগ ধরে রাখতে সুবিধা হয়। কিবলামুখী হয়ে জায়নামাজে দাঁড়ান।
৩. তাহাজ্জুদ নামাজের নিয়ত: অনেকেই নিয়ত নিয়ে চিন্তায় পড়েন। আরবি নিয়ত না জানলে কোনো সমস্যা নেই। মনের ইচ্ছাই হলো আসল নিয়ত। আপনি মনে মনে এতটুকু ভাববেন যে, “আমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কেবলামুখী হয়ে দুই রাকাত তাহাজ্জুদের নফল নামাজ আদায় করছি, আল্লাহু আকবার।” এই এতটুকু ভাবনাই আপনার নিয়তের জন্য যথেষ্ট।
আরো আছে!
৪. নামাজ শুরু করা: ‘আল্লাহু আকবার’ বলে হাত বাঁধুন। এরপর সানা পড়ুন।
৫. সূরা পাঠ: এরপর সূরা ফাতিহা পড়ুন। সূরা ফাতিহা পড়ার পর কোরআনের যেকোনো সূরা বা আয়াত আপনি মেলাতে পারেন। অনেকেই জানতে চান, তাহাজ্জুদ নামাজের নির্দিষ্ট কোনো সূরা আছে কিনা? না, কোনো নির্দিষ্ট সূরা নেই। আপনি যে সূরাগুলো ভালো পারেন, সেগুলোই পড়বেন। তবে রাসূল (সা.) তাহাজ্জুদ নামাজে দীর্ঘ সূরা তেলাওয়াত করতেন। আপনার যদি বড় সূরা মুখস্থ থাকে, তবে বড় সূরা পড়বেন। আর না থাকলে সূরা ইখলাস, ফালাক, নাস ইত্যাদি ছোট সূরা দিয়েও পড়তে পারেন।
৬. রুকু ও সিজদাহ: এরপর স্বাভাবিক নামাজের মতোই রুকু করুন। রুকু থেকে উঠে সিজদায় যান। তাহাজ্জুদের সিজদাতে একটু বেশি সময় দেওয়ার চেষ্টা করবেন। সিজদায় আল্লাহর কাছে নিজের ভাষায় দোয়া করতে পারেন (যদি নফল নামাজ হয় এবং মাতৃভাষায় দোয়া করার মাসয়ালা মেনে চলেন)। তবে আরবিতে দোয়া পড়াই সবচেয়ে নিরাপদ ও উত্তম।
৭. সালাম ফেরানো: এভাবে ২ রাকাত পূর্ণ করে আত্তাহিয়্যাতু, দরুদ শরীফ এবং দোয়া মাসুরা পড়ে ডানে-বামে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করবেন।
তাহাজ্জুদ নামাজ কয় রাকাত পড়বেন?
তাহাজ্জুদ নামাজ কয় রাকাত পড়তে হবে এটা নিয়ে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে। রাসূল (সা.) সাধারণত ৮ রাকাত তাহাজ্জুদ এবং ৩ রাকাত বিতরসহ মোট ১১ রাকাত পড়তেন। তবে আপনি চাইলে সর্বনিম্ম ২ রাকাত পড়তে পারেন। এরপর ৪, ৬, ৮ বা ১২ রাকাত পর্যন্ত পড়া যায়। পুরোটাই নির্ভর করছে আপনার সময় এবং শারীরিক সামর্থ্যের ওপর।
আমার ব্যক্তিগত সাজেশন হলো, আপনি যদি নতুন শুরু করেন, তবে প্রথম দিনই ৮ রাকাত পড়ার দরকার নেই। ২ রাকাত দিয়ে শুরু করুন। কিন্তু এই ২ রাকাত খুব ধীরে ধীরে, মনোযোগ দিয়ে এবং খুশুখুজুর সাথে পড়ুন। কোয়ান্টিটির চেয়ে কোয়ালিটির দিকে বেশি ফোকাস দিন।
কোথায় এবং কীভাবে মনোযোগ দিয়ে তাহাজ্জুদ পড়বেন?
তাহাজ্জুদ নামাজ কোথায় পড়বেন? এই নামাজ পড়ার জন্য সবচেয়ে উত্তম জায়গা হলো নিজের ঘর। পুরুষদের জন্য ফরজ নামাজ মসজিদে পড়া সুন্নতে মুয়াক্কাদা হলেও, নফল বা সুন্নাত নামাজ ঘরে পড়ার জন্য ইসলামে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে। এতে করে ঘর বরকতময় হয় এবং ঘরের ছোট বাচ্চারাও নামাজ দেখে শিখতে পারে। মহিলাদের জন্য তো ঘরের ভেতরের অংশই সবচেয়ে উত্তম।
নামাজে মনোযোগ ধরে রাখার জন্য একটা দারুন টিপস হলো— যখন আপনি সূরাগুলো পড়বেন, তখন তার অর্থ বোঝার চেষ্টা করবেন। চোখ বন্ধ করে ভাববেন যে আপনি সরাসরি আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে আছেন এবং তিনি আপনাকে দেখছেন। রাতের নীরবতায় এই অনুভূতি আপনার চোখের পানি বের করে আনবে।
তাহাজ্জুদ নামাজের দোয়া এবং মোনাজাত
নামাজ শেষ করার পর হলো আসল কাজ, আর তা হলো— মোনাজাত বা তাহাজ্জুদ নামাজের দোয়া। এই সময়টাতে আপনি জায়নামাজে বসে দুহাত তুলে আল্লাহর কাছে আপনার জীবনের সব দুঃখ, কষ্ট, অভাব, অভিযোগের কথা খুলে বলবেন।
কিভাবে দোয়া করবেন? একদম সাধারণ মানুষের ভাষায়, আপনার নিজের ভাষায় কথা বলুন। আল্লাহ আপনার মনের ভাষা বোঝেন। বলুন, “হে আল্লাহ, আমার এই সমস্যা, আমাকে এই বিপদ থেকে মুক্তি দিন। আমার রিযিকে বরকত দিন। আমার বাবা-মাকে ক্ষমা করে দিন।”
রাসূল (সা.) তাহাজ্জুদের সময় একটি বিশেষ দোয়া পড়তেন। সেটি হলো:
“আল্লাহুম্মা লাকাল হামদু আনতা কাইয়্যিমুস সামাওয়াতি ওয়াল আরদি ওয়া মান ফিন্না…” (সহীহ বুখারী)। আপনি চাইলে এই আরবি দোয়াটি মুখস্থ করে নিতে পারেন।
আর তা না পারলে শুধু “রাব্বানা আতিনা ফিদ দুনিয়া হাসানাতাও ওয়া ফিল আখিরাতি হাসানাতাও ওয়াকিনা আজাবান নার” পড়ুন। সাইয়্যিদুল ইস্তিগফার (শ্রেষ্ঠ ক্ষমাপ্রার্থনার দোয়া) পড়াটা এই সময়ে খুব দড়কার।
তাহাজ্জুদ নামাজ নিয়ে আমার কিছু ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও টিপস:
বন্ধুরা, আমি যখন প্রথম তাহাজ্জুদ শুরু করার চেষ্টা করি, তখন সকালে অ্যালার্ম বাজলেও আলসেমি করে উঠতে পারতাম না। শয়তান এসে কানে মন্ত্র পড়তো— “এখনো অনেক রাত বাকি, আরেকটু ঘুমাও।” এই সমস্যা থেকে বাঁচতে আমি একটা ট্রিকস বের করলাম। আমি রাতে এশার নামাজের পরপরই দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ার চেষ্টা করতাম। মোবাইল ফোন দূরে রেখে ঘুমাতাম। আর অ্যালার্ম ঘড়িটা বিছানা থেকে একটু দূরে রাখতাম, যাতে অ্যালার্ম বন্ধ করতে হলে আমাকে বাধ্য হয়ে বিছানা থেকে উঠতে হয়। একবার উঠে গেলে ওযু করে ফেললে আর ঘুম ধরে না।
আরেকটা জিনিষ হলো, দিনে গুনাহের কাজ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখা। অনেক আলেম বলেন, দিনে আমরা যেসব পাপ কাজ করি, তার শাস্তিস্বরূপ রাতে আমাদের তাহাজ্জুদের তৌফিক ছিনিয়ে নেওয়া হয়। তাই দিনের বেলা চোখ, কান ও জিহ্বাকে হেফাজত করা অবশই জরুরি।
শেষ কথা:
প্রিয় পাঠক ভাই ও বোনেরা, তাহাজ্জুদ হলো এমন একটি রশি, যা দিয়ে বান্দা সরাসরি তার মালিককে আঁকড়ে ধরতে পারে। আপনার জীবনে যদি এমন কোনো চাওয়া থাকে যা পূরণ হচ্ছে না, এমন কোনো ব্যথা থাকে যা কাউকে বলতে পারছেন না তবে আজ রাতেই উঠে পড়ুন। ওযু করে জায়নামাজে দাঁড়িয়ে যান। আপনার সব অভিযোগ সেই মহান রবের কাছে পেশ করুন। দেখবেন, আপনার মনটা কতটা হালকা হয়ে গেছে।
আজকের এই আর্টিকেলটি পড়ে আপনি যদি একটু হলেও মোটিভেটেড হন, তবে এই লেখাটি আপনার বন্ধু ও পরিবারের সাথে অবশই শেয়ার করবেন। আপনার একটি শেয়ার হয়তো আরেকজনকে তাহাজ্জুদ পড়ার প্রতি আগ্রহী করে তুলবে।
FAQ:
প্রশ্ন ১: ঘুম না ভাঙলে বা রাতে না ঘুমালে কি তাহাজ্জুদ পড়া যাবে?
উত্তর: তাহাজ্জুদ শব্দের অর্থই হলো ঘুম থেকে ওঠা। তাই এশার পর কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে তারপর উঠে পড়াটাই হলো সুন্নাহ। তবে যদি কোনো কারণে আপনার সারা রাত ডিউটি থাকে বা ঘুমানোর সুযোগ না হয়, তবে আপনি শেষ রাতে নফল বা কিয়ামুল লাইল হিসেবে নামাজ পড়তে পারেন, আল্লাহ চাইলে তাহাজ্জুদের সওয়াব দিয়ে দিতে পারেন।
প্রশ্ন ২: তাহাজ্জুদ নামাজ কি বিতর নামাজের আগে নাকি পরে পড়তে হয়?
উত্তর: নিয়ম হলো বিতর নামাজকে রাতের সর্বশেষ নামাজ হিসেবে পড়া। তাই আপনি যদি নিশ্চিত থাকেন যে আপনি তাহাজ্জুদের জন্য উঠতে পারবেন, তবে এশার সময় বিতর না পড়ে, তাহাজ্জুদ পড়ার পর সবশেষে বিতর পড়বেন। আর যদি ওঠার নিশ্চয়তা না থাকে, তবে এশার সাথেই বিতর পড়ে নেবেন। পরে উঠলে শুধু তাহাজ্জুদ পড়বেন, পুনরায় বিতর পড়ার প্রয়োজন নেই।
প্রশ্ন ৩: তাহাজ্জুদ নামাজে কি সূরা জোরে পড়া যায়?
উত্তর: নফল নামাজে তেলাওয়াত আস্তে বা চুপিচুপি পড়াই উত্তম, যাতে অন্যের ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটে। তবে যদি আপনি একা থাকেন এবং জোরে পড়লে আপনার নামাজে মনোযোগ বেশি আসে, তবে কিছুটা আওয়াজ করে পড়তে পারেন।
প্রশ্ন ৪: মহিলাদের তাহাজ্জুদ পড়ার নিয়ম কি আলাদা?
উত্তর: না, পুরুষ এবং মহিলাদের তাহাজ্জুদ নামাজের নিয়মে আলাদা কোনো পার্থক্য নেই। মহিলারা তাদের ঘরে পবিত্র স্থানে বসে স্বাভাবিক নিয়মে নামাজ আদায় করবেন। তবে মাসিক বা পিরিয়ড চলাকালীন অবস্থায় নামাজ পড়া থেকে বিরত থাকতে হবে, ওই সময়ে শুধু তাসবিহ-তাহলীল করা যেতে পারে।
প্রশ্ন ৫: তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ার জন্য কি নির্দিষ্ট কোনো সূরা মুখস্থ থাকা বাধ্যতামূলক?
উত্তর: একদমই না। আপনার কোরআনের যে কোনো সূরা বা আয়াত মুখস্থ থাকলেই আপনি তা দিয়ে তাহাজ্জুদ পড়তে পারেন। সূরা ফাতিহার সাথে সূরা ইখলাস, সূরা ফালাক বা সূরা নাস মিলিয়েও পড়া যায়।


