আসসালামু আলাইকুম পাঠক বন্ধুরা। কেমন আছেন সবাই? আশা করি ভালোই আছেন। আজকে আপনাদের সাথে এমন একটা বিষয় নিয়ে কথা বলবো, যেটা বর্তমান সময়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে হট টপিক। খবরটি হলো সর্বজনীন পেনশন স্কিম নিয়ে।
কেন আপনার ভবিষ্যতের কথা ভাবা জরুরি?
দেখুন ভাই, যৌবনকালটা চোখের পলকেই কেটে যায়। গায়ের জোর আজ আছে, কাল নাও থাকতে পারে।
কিন্তু পেটের ক্ষুধা তো আর বুড়ো হবে না, তাই না? শেষ বয়সে যেন ছেলে-মেয়ের হাতের দিকে তাকিয়ে না থাকতে হয়, বা কারো কাছে হাত পাততে না হয়,
সেজন্য বাংলাদেশ সরকার যে সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালু করেছে, এটা আসলেই প্রশংসার দাবি রাখে।
আমি ব্যক্তিগতভাবে এই বিষয়টা নিয়ে অনেক ঘাটাঘাটি করেছি। অনেকেই আছেন যারা এখনো কনফিউশনে আছেনএটা আসলে কী?
টাকা দিলে কি টাকা ফেরত পাবো? লাভ কেমন? বা গ্রামে বসে কিভাবে খুলবো? কোনো টেনশন নাই,
আজকের এই আর্টিকেলে আমি একদম পানির মতো সহজ করে সব বুঝিয়ে দেবো। মনে হবে যেন আপনার সামনে বসে গল্প করছি।
সর্বজনীন পেনশন স্কিম আসলে কী?
সহজ কথায়, আপনি এখন প্রতি মাসে নির্দিষ্ট পরিমাণ কিছু টাকা সরকারি তহবিলে জমা রাখবেন।
সরকার সেই টাকার সাথে আরও কিছু প্রফিট বা মুনাফা যোগ করে আপনার বয়স যখন ৬০ বছর হবে, তখন থেকে আজীবন প্রতি মাসে আপনাকে পেনশন হিসেবে টাকা দেবে।
মানে অনেকটা সরকারি চাকরিজীবীদের মতো সুবিধা এখন সাধারণ জনগণও পাবে।
কারা কারা এই স্কিমের আওতায় আসবেন?
সবাই কিন্তু সব স্কিমে টাকা জমাতে পারবেন না। সরকার এখানে বুদ্ধি করে ৪টা ক্যাটাগরি বা ভাগ করে দিয়েছে। আপনি কোনটায় পড়েন, সেটা আগে দেখে নিন:
১. প্রবাস স্কিম: যারা বিদেশে থাকেন (প্রবাসী ভাই-বোনদের জন্য)।
২. প্রগতি স্কিম: যারা বেসরকারি চাকরিতে আছেন বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন।
৩. সুরক্ষা স্কিম: যারা নিজের কাজ নিজে করেন (যেমন- কৃষক, রিকশাচালক, শ্রমিক, কামার, কুমার)।
৪. সমতা স্কিম: যাদের বার্ষিক আয় ৬০ হাজার টাকার কম (অতি দরিদ্র)। এদের জন্য বিশেষ সুবিধা হলো, আপনি ৫০০ টাকা দিলে সরকার আরও ৫০০ টাকা ভর্তুকি দেবে। দারুণ না?
ঘরে বসে রেজিস্ট্রেশন করার নিয়ম
অনেকেই ভাবেন, সরকারি কাজ মানেই ব্যাংকে গিয়ে লম্বা লাইন বা দালালের খপ্পর। বিশ্বাস করেন, এই ডিজিটাল যুগে ওসবের দিন শেষ।
আমি নিজে আমার বাবার জন্য গতসপ্তাহে বুঝি রেজিস্ট্রেশন করলাম, মোবাইল দিয়েই। আপনিও পারবেন।
প্রথমে আপনার মোবাইলের বা কম্পিউটারের ব্রাউজার থেকে upension.gov.bd এই ওয়েবসাইটে যান। এটা সরকারি অফিসিয়াল সাইট।
হোমপেইজে দেখবেন “পেনশনার রেজিস্ট্রেশন” নামে একটা অপশন আছে। সেখানে ক্লিক করুন। ভয় পাবেন না, সব বাংলায় লেখা আছে।
কিছু শর্ত আসবে, সেগুলো পড়ে “সম্মত আছি” বাটনে ক্লিক করুন। এরপর আপনার এনআইডি (NID) নম্বর, জন্ম তারিখ এবং মোবাইল নম্বর দিয়ে সাবমিট করুন। মোবাইলে একটা ওটিপি (OTP) কোড আসবে, সেটা বসালেই কেল্লাফতে!
এবার আপনার বাৎসরিক আয় কত এবং আপনি কোন স্কিম (যেমন- প্রগতি বা সুরক্ষা) নিতে চান সেটা সিলেক্ট করুন।
এখানে নমিনি বা উত্তরাধিকারীর নামও দিতে হবে। তাই যাকে নমিনি করবেন তার এনআইডি নম্বর হাতে রাখবেন।
টাকা জমা দেবেন কীভাবে?
ভাই রে, টাকা জমা দেওয়া এখন ফেসবুক চালানোর চেয়েও সহজ। সোনালী ব্যাংকে গিয়ে লাইন ধরার দরকার নাই।
আপনার ফোনে বিকাশ (bKash), নগদ (Nagad) বা রকেট আছে না? রেজিস্ট্রেশন শেষে পেমেন্ট অপশনে গিয়ে মোবাইল ব্যাংকিং সিলেক্ট করেই আপনি প্রথম কিস্তির টাকা জমা দিতে পারবেন।
টাকা জমা হলেই সাথে সাথে আপনার ফোনে মেসেজ চলে আসবে এবং আপনি একটা স্লিপ ডাউনলোড করতে পারবেন। এই স্লিপটা সযত্নে রেখে দেবেন, যদিও অনলাইনে সব রেকর্ড থাকে।
কেন আপনার আজই রেজিস্ট্রেশন করা উচিত?
এটাতে সরকারি গ্যারান্টি থাকছে, তাই টাকা মার যাওয়ার ভয় নাই। ব্যাংকের ডিপিএস-এর চেয়ে এখানে লাভের পরিমাণ বা রিটার্ন অনেক বেশি হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
কর রেয়াত মানে পেনশনের জন্য যে টাকা জমা দেবেন, তার ওপর সরকারকে কোনো ইনকাম ট্যাক্স দিতে হবে না। এটা একটা বড় প্লাস পয়েন্ট।
এবং শেষ বয়সে পকেটে টাকা থাকলে সবার কাছেই সম্মান পাওয়া যায়, কথাটা তিতা হলেও কিন্তু এটা সত্য।
সতর্কতা ও আমার শেষ কথা
অনলাইনে আবেদন করার সময় দয়াকরে তাড়াহুড়া করবেন না।
নামের বানান যেন এনআইডি কার্ডের সাথে হুবহু মিলে থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখবেন।
ভুল হলে পরে ঠিক করা বেশ ঝামেলার কাজ। আর হ্যাঁ, প্রতি মাসে ঠিক সময়ে কিস্তি দেওয়ার চেষ্টা করবেন, তাহলে কোনো জরিমানার ঝামেলায় পড়তে হবে না।
প্রিয় পাঠক, খবরটি শুধু খবর হিসেবে না নিয়ে নিজের জীবনের জন্য কাজে লাগান।
আজই হয়তো ৫-১০০০ টাকা আপনার কাছে খুব বড় কিছু না, কিন্তু ২০ বছর পর এই টাকাই আপনার লাঠির মতো শক্ত হয়ে দাঁড়াবে।
আরটিকেলটি ভালো লাগলে শেয়ার করে আপনার বন্ধু বা আত্মীয়কে জানিয়ে দিন, তারাও হয়তো উপকৃত হবে। ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন। আল্লাহ হাফেজ।
FAQ:
প্রশ্ন: সর্বজনীন পেনশন স্কিমে কত টাকা জমা দিলে কত টাকা পাবো?
উত্তর: এটি নির্ভর করে আপনি কত বছর ধরে টাকা জমাচ্ছেন তার ওপর। যেমন, ৪২ বছর ধরে মাসে ১০০০ টাকা জমা দিলে ৬০ বছর বয়সের পর মাসে প্রায় ৩৪,০০০ টাকা পেনশন পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
প্রশ্ন: ১৮ বছরের নিচে কেউ কি পেনশন স্কিম খুলতে পারবে?
উত্তর: না, এই স্কিমে অংশ নিতে হলে আবেদনকারীর বয়স অবশ্যই ১৮ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে হতে হবে (বিশেষ বিবেচনায় ৫০-এর বেশিরাও পারবেন, তবে ১০ বছর চাঁদা দিতে হবে)।
প্রশ্ন: মাঝপথে আবেদনকারী মারা গেলে টাকার কী হবে?
উত্তর: আল্লাহ না করুক এমন হলে, আবেদনকারীর জমানো টাকা এবং মুনাফাসহ পুরো অর্থ তার নমিনি (উত্তরাধিকারী) পাবেন। অথবা নমিনি চাইলে স্কিমটি চালিয়েও যেতে পারেন।
প্রশ্ন: আমি কি যেকোনো সময় টাকা তুলে ফেলতে পারবো?
উত্তর: না, এটি দীর্ঘমেয়াদী সঞ্চয়। তবে বিশেষ প্রয়োজনে (যেমন নিজের বা পরিবারের চিকিৎসা) জমানো টাকার ৫০% পর্যন্ত ঋণ বা লোন হিসেবে নেওয়া যাবে।


