২০২৬ সালের ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগির খাবারের দামের তালিকা চার্ট।

নারিশ ফিডের দাম ২০২৬ মূল্য তালিকা: ব্রয়লার, লেয়ার ও মাছের খাদ্যের বর্তমান বাজার দর

আসসালামু আলাইকুম খামারি ভাই ও বন্ধুরা! কেমন আছেন আপনারা? আশা করি ২০২৬ সালের এই শুরুতে আপনাদের খামার বা প্রজেক্ট নিয়ে আল্লাহর রহমতে ভালোই আছেন।

আপনারা যারা পোল্ট্রি, ডেইরি কিংবা মৎস্য খামারের সাথে জড়িত, তারা খুব ভালো করেই জানেন খামারের লাভ-লস এখন আর শুধু ভাগ্যের ওপর নির্ভর করে না, এটা পুরোটাই এখন অংকের খেলা। আর এই অংকের প্রধান অংশটাই জুড়ে আছে ফিড বা খাবার। মুরগির ভালো গ্রোথ, সঠিক এফসিআর (FCR) আর দিনশেষে পকেটে দুই টাকা লাভ সবকিছুর মূলে আছে সঠিক মানের ফিড নির্বাচন।

আমার কাছে অনেকেই জানতে চেয়েছেন, ভাই, ২০২৬ সালে এসে নারিশ ফিডের দাম কি বেড়েছে? এখনকার বাজার দর কত?। কারণ, গত কয়েক বছরে ফিডের বাজারে যে অস্থিরতা গেছে, তাতে টেনশন থাকাটাই স্বাভাবিক। আপনাদের এই টেনশন কমাতেই আজ আমি ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসের একদম লেটেস্ট বাজার দর, ফিডের গুণাগুণ এবং খরচ কমানোর কিছু গোপন টেকনিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

আজকের এই আর্টিকেলটি একটু সময় নিয়ে পড়ুন, কারণ এখানে আমি শুধু দামই বলিনি, বরং এমন কিছু ব্যবসায়িক বুদ্ধি শেয়ার করেছি যা আপনার লোকসান কমাতে সাহায্য করবে ইনশাল্লাহ।

২০২৬ সালে নারিশ ফিডের বর্তমান বাজার পরিস্থিতি

ভাই, সত্যি কথা বলতে কী, ২০২৬ সালে এসেও ফিডের দাম যে খুব কমেছে তা কিন্তু না। আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের (ভুট্টা ও সয়াবিন মিল) দাম এবং ডলারের রেটের কারণে দামটা একটু চড়াই আছে। তবে সুখবর হলো, নারিশ তাদের কোয়ালিটি বা গুণাগুণ ধরে রেখেছে, যার ফলে খামারিরা এখনো এই ব্র্যান্ডের ওপর ভরসা পাচ্ছেন।

আমরা বাজার যাচাই করে এবং বিভিন্ন ডিলারের সাথে কথা বলে নারিশ ফিডের ২০২৬ সালের বর্তমান মূল্য তালিকা তৈরি করেছি। তবে মনে রাখবেন, এলাকাভেদে পরিবহন খরচের কারণে বস্তাপ্রতি ২০-৫০ টাকা কমবেশি হতে পারে।

নারিশ ব্রয়লার ফিডের দাম ২০২৬ (৫০ কেজির বস্তা)

ব্রয়লার খামারি ভাইদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ৩০-৩২ দিনের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত ওজন আনা। আর সেটার জন্য নারিশের তিনটি ধাপের খাবার রয়েছে। চলুন দেখে নিই ২০২৬ সালের বর্তমান রেট:

ফিডের নাম খাদ্যের ধরন বর্তমান বাজার দর (MRP) আনুমানিক নগদ মূল্য (ডিলার রেট)
ব্রয়লার প্রি-স্টার্টার দানাদার (Crumble) ৩,৫৫০ টাকা ৩,৩৫০ – ৩,৩৮০ টাকা
ব্রয়লার স্টার্টার দানাদার (Crumble) ৩,৫০০ টাকা ৩,৩০০ – ৩,৩৫০ টাকা
ব্রয়লার গ্রোয়ার পেলেট (Pellet) ৩,৪৫০ টাকা ৩,২৫০ – ৩,৩০০ টাকা

টিপস: ব্রয়লার প্রি-স্টার্টার খাওয়ানোর সময় অনেকেই কৃপনতা করেন। কিন্তু বাচ্চার প্রথম ১০ দিন এই দামী খাবারটা খাওয়ালে পরবর্তী সময়ে ইমিউনিটি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বেড়ে যায়, যা পরে ওষুধের খরচ কমায়।

নারিশ লেয়ার ফিডের দাম ২০২৬ (ডিম পাড়া মুরগির জন্য)

যারা লেয়ার বা ডিমের মুরগি পালেন, তাদের হিসাবটা একটু ভিন্ন। এখানে মূল লক্ষ্য হলো দীর্ঘদিন ধরে ডিমের প্রোডাকশন ঠিক রাখা। ২০২৬ সালে লেয়ার ফিডের দাম কিছুটা স্থিতিশীল আছে।

ফিডের নাম ব্যবহারের সময় বর্তমান বাজার দর (MRP) আনুমানিক নগদ মূল্য
লেয়ার স্টার্টার ১-৮ সপ্তাহ ৩,২০০ টাকা ৩,০০০ – ৩,০৫০ টাকা
লেয়ার গ্রোয়ার ৯-১৮ সপ্তাহ ৩,১০০ টাকা ২,৯০০ – ২,৯৫০ টাকা
লেয়ার লেয়ার-১ ডিম পাড়া অবস্থায় ২,৮৫০ টাকা ২,৭০০ – ২,৭৫০ টাকা

বিশেষ দ্রষ্টব্য: লেয়ার লেয়ার-১ খাবারটি মুরগির ১৯ সপ্তাহ বয়স থেকে শুরু করে বাতিলের আগ পর্যন্ত খাওয়ানো হয়। এই খাবারে ক্যালসিয়ামের ব্যালেন্সটা খুব ভালো থাকে, যার ফলে ডিমের খোসা শক্ত হয় এবং ফাটা ডিমের সংখ্যা কমে যায়।

সোনালি ও কক মুরগির খাবারের দাম তালিকা

বর্তমানে দেশে সোনালি মুরগির চাহিদা আকাশচুম্বী। বিয়া বাড়ি থেকে রেস্টুরেন্ট সবখানেই সোনালি মুরগির কদর। তাই সোনালি মুরগির খাবারের দাম ২০২৬ জানাটা খুব জরুরি।

  • সোনালি স্টার্টার: বর্তমান বাজারে এর নগদ মূল্য প্রায় ২,৯০০ থেকে ২,৯৫০ টাকা (৫০ কেজি)। এটি সোনালি বাচ্চার হাড় গঠনে খুব ভালো কাজ করে।

  • সোনালি গ্রোয়ার: এর বর্তমান দাম প্রায় ২,৮৫০ থেকে ২,৯০০ টাকা। মুরগির ওজন ১ কেজি পার না হওয়া পর্যন্ত এটি খাওয়াতে হয়।

নারিশ মাছের খাদ্যের দাম (ফিস ফিড প্রাইস লিস্ট ২০২৬)

শুধু মুরগি নয়, মাছ চাষি ভাইদের জন্যও নারিশ ফিড এখন আস্থার প্রতীক। বিশেষ করে কই, শিং, মাগুর ও পাঙাশ মাছের জন্য ভাসমান খাবারের চাহিদা ব্যাপক।

  1. নার্সারি পাউডার/মাইক্রো: ২৫ কেজির বস্তা প্রায় ১,৪৫০ – ১,৫০০ টাকা। এটি পোনা মাছের জন্য অমৃতের মতো কাজ করে।

  2. ফ্লোটিং ফিস ফিড (স্টার্টার): ৫০ কেজির বস্তা বর্তমানে ২,৫০০ – ২,৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

  3. ফ্লোটিং গ্রোয়ার: বড় মাছের জন্য এই ফিডটি এখন ২,৪০০ – ২,৪৫০ টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে।

  4. সিংকিং ফিড (ডুবন্ত): কার্প জাতীয় মাছের জন্য ডুবন্ত খাবারের দাম একটু কম, ৫০ কেজি বস্তা প্রায় ২,১০০ – ২,১৫০ টাকা

কেন ২০২৬ সালে এসেও খামারিরা নারিশ ফিড খুঁজছেন?

বাজারে তো অনেক ফিড আছে, তাহলে খামারিরা কেন এখনো নারিশ খুঁজছেন? আমি নিজে একজন কন্টেন্ট রাইটার হওয়ার পাশাপাশি খামারিদের সাথে কথা বলে যা বুঝেছি, তা হলো

  • সঠিক FCR (Feed Conversion Ratio): খামারিরা দেখেছেন, অন্য কোম্পানির ৩ কেজি খাবার খেয়ে মুরগি যে ওজন দেয়, নারিশের ২.৮ কেজি খাবার খেয়েই সেই ওজন চলে আসে। বর্তমান চড়া বাজারের যুগে এই ২০০ গ্রাম খাবারের সেভ মানেই অনেক টাকা।

  • শুকনা বিষ্ঠা ও লিটার ভালো থাকা: পোল্ট্রি খামারে অ্যামোনিয়া গ্যাস একটা বড় সমস্যা। নারিশ ফিড খাওয়ালে মুরগির পায়খানা বা ড্রপিং তুলনামূলক শুকনা হয়, ফলে লিটার বা তুষ দ্রুত নষ্ট হয় না। এতে খামারের পরিবেশ ভালো থাকে।

  • মাংসের রং ও স্বাদ: ব্রয়লার মুরগির মাংসের রং সাদাটে না হয়ে একটু লালচে ভাব থাকে, যা পাইকারি বাজারে বিক্রি করতে সুবিধা হয়।

ফিডের খরচ কমানোর কিছু বাস্তবমুখী পরামর্শ (Secret Tips)

যেহেতু দামের ওপর আমাদের হাত নেই, তাই খরচ কমাতে আমাদের একটু কৌশলী হতে হবে। এই টিপসগুলো ফলো করলে আশা করি বস্তাপ্রতি অন্তত ৫০-১০০ টাকা সেভ করতে পারবেন:

১. ডিলারের সাথে সম্পর্ক: খুচরা দোকান থেকে এক-দুই বস্তা না কিনে সরাসরি এলাকার মূল ডিলারের সাথে কথা বলুন। তাদের বলুন আপনি নিয়মিত নিবেন। ক্যাশ মেমো ছাড়া ‘নেট ক্যাশ’ এ মাল কিনলে বস্তায় ৩০-৪০ টাকা ছাড় পাওয়া যায়।
২. বাল্ক পারচেজ (একসাথে কেনা): সম্ভব হলে ৩-৪ জন খামারি মিলে একসাথে ১ টন বা তার বেশি ফিড অর্ডার করুন। এতে কোম্পানি থেকে সরাসরি গাড়ি আপনার খামারে আসতে পারে, অথবা ডিলার আপনাকে বড় ডিসকাউন্ট দিতে বাধ্য থাকবে।
৩. ফিড নষ্ট রোধ করা: বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, খামারে ইঁদুর এবং ফিড পাত্র থেকে পড়ে গিয়ে প্রায় ৫% খাবার নষ্ট হয়। পাত্রে খাবার দেওয়ার সময় সতর্ক হোন, খাবারের অপচয় রোধ করা মানেই লাভ।
৪. ওজন মেপে খাওয়ানো: চোখের আন্দাজে খাবার না দিয়ে, মুরগির বয়স ও বডি ওয়েট অনুযায়ী গ্রাম মেপে খাবার দিন। ওভারফিডিং বা অতিরিক্ত খাবার দিলেই যে ওজন বাড়বে তা নয়, বরং এতে চর্বি জমে লস হতে পারে।

সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

প্রশ্ন: নারিশ ফিডের ৫০ কেজি বস্তার বর্তমান রেট কত?
উত্তর: ২০২৬ এর জানুয়ারি অনুযায়ী, ব্রয়লার স্টার্টার প্রায় ৩,৩০০-৩,৩৫০ টাকা এবং লেয়ার ফিড প্রায় ২,৭০০ টাকা। তবে এটা ডিলারভেদে সামান্য কমবেশি হতে পারে।

প্রশ্ন: নারিশ ফিড কি বাকিতে পাওয়া যায়?
উত্তর: সাধারণত ডিলাররা নতুন খামারিদের বাকি দিতে চান না। তবে পুরনো সম্পর্ক থাকলে এবং নিয়মিত লেনদেন ভালো থাকলে অনেক ডিলার আংশিক বাকিতে ফিড দেন। তবে নগদে কেনাই বুদ্ধিমানের কাজ, কারণ বাকিতে কিনলে বস্তাপ্রতি দাম বেশি ধরা হয়।

প্রশ্ন: সোনালি মুরগির জন্য কোন ফিডটি সেরা?
উত্তর: সোনালি মুরগির জন্য ‘নারিশ সোনালি স্পেশাল’ ফিডটি খুব ভালো রেজাল্ট দিচ্ছে। এতে প্রোটিনের মাত্রা এমনভাবে সেট করা হয়েছে যে মুরগি ৭০-৭৫ দিনেই ১ কেজির কাছাকাছি চলে আসে।

টিকে থাকাই এখন বড় লাভ

প্রিয় খামারি ভাই ও বোনেরা, ২০২৬ সালটি ব্যবসার জন্য চ্যালেঞ্জিং হলেও অসম্ভব কিছু নয়। নারিশ ফিডের দাম হয়তো কিছুটা বেশি মনে হতে পারে, কিন্তু সস্তা ফিড খাইয়ে ৩০ দিন পর যদি দেখেন মুরগির ওজন আসেনি, তখন লসটা আরও বড় হবে। তাই ফিড নির্বাচনের সময় শুধু দাম না দেখে গুণাগুণ বিচার করবেন।

আমার এই দীর্ঘ লেখাটির উদ্দেশ্য ছিল আপনাদের কাছে একদম স্বচ্ছ ও সঠিক তথ্যটি পৌঁছে দেওয়া। লেখাটি যদি আপনাদের উপকারে আসে, তবেই আমার পরিশ্রম সার্থক।

আপনার মতামত আমাদের কাছে খুব দামী:

আপনি বর্তমানে আপনার খামারে কোন ফিড ব্যবহার করছেন? নারিশ ফিড নিয়ে আপনার কোনো অভিযোগ বা ভালো অভিজ্ঞতা আছে কি? নিচে কমেন্ট বক্সে লিখে জানান। আপনাদের কমেন্টগুলো নতুন খামারিদের জন্য অনেক বড় শিক্ষার উৎস হতে পারে।

সবার খামারের উন্নতি কামনা করছি। আল্লাহ আপনাদের বরকত দান করুন। দেখা হবে পরবর্তী আপডেটে, ততক্ষণ পর্যন্ত ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।

বিঃদ্রঃ বাজার সর্বদা পরিবর্তনশীল। এই দামগুলো ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসের বাজার বিশ্লেষণের ওপর ভিত্তি করে দেওয়া। তার পরেও কেনার আগে অবশ্যই আপনার নিকটস্থ ডিলারের সাথে যাচাই করে নিবেন।

×
Scroll to Top